ইরান যুদ্ধের কারণে তীব্র সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ব তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠার পর ইস্টার্ন রিফাইনারি কখনো এমন তেল সংকটে পড়েনি।
সরকারের জ্বালানি বিভাগ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এ বছরের মার্চ শিডিউলের ক্রুড অয়েল পার্সেল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতর কারণে যথাসময়ে পৌঁছাতে না পারায় বর্তমানে ইআরএল লো ফিডে চালু রাখা হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, রিফাইনারির স্টোরেজ ট্যাংকের তলানিতে থাকা জরুরি মজুত ডেড স্টক ব্যবহার করে কোনোভাবে দুটি ইউনিট চালু রাখা হয়েছে। আর দুটি ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ রেখে মেইনটেনেন্স বা রক্ষণাবেক্ষণে পাঠানো হয়েছে।
বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসে শেষ তেলের চালান এসেছে। যুদ্ধের কারণে মার্চের পর থেকে আমদানি জটিলতা এবং এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
“মার্চ মাসে আমাদের দুটো কনসাইনমেন্ট ছিল এক লাখ টন করে। আর এপ্রিলে একটা এক লাখ টনের। মার্চে একটা ছিল দুই তারিখে, সেটা শিডিউল অনুযায়ী লোড করে অপেক্ষা করছে- সেটার জন্য আমরা ইরানি দূতাবাস এবং সব জায়গায় যোগাযোগ করেছি। মাঝখানে আমরা কনফার্মেশন পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আবার হরমুজে সমস্যার কারণে আটকে গেছে। আমাদের শিপ রেডি আমরা সুযোগ পেলেই নিয়ে আসবো।
“আর এপ্রিলের ২০-২২ তারিখে যেটা ছিল সেটা টাইমলি রওনা দেবে। আমরা আশা করছি, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে এসে পৌঁছাবে” বলেন মি. রহমান।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বিপিসি জানিয়েছে, আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ক্রুড অয়েলের একটি চালান আসার কথা রয়েছে। এরপর রিফাইনারি আবার পুরোদমে সচল হবে।
তবে এই রিফাইনারির দুটি ইউনিট বন্ধের কারণে দেশে তেলের কোনো সংকট হবে না বলে দাবি করেছে বিপিসি।
পরিশোধিত তেলের ঘাটতি পূরণ করতে অতিরিক্ত ডিজেল ও অকটেন আমদানি এবং মজুত করা হয়েছে। বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান দাবি করেছেন, রিফাইনারি বন্ধ হলেও তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় তেল আমদানি করা হচ্ছে।
“এই মাসে ১৭টা কার্গো আসার কথা ছিল। এর মধ্যে দুটো ফোর্স মেজার ঘোষণা করা হয়েছে। আর একটা ডেফারড ঘোষণা করা হয়েছে। বাকী ১৪ টার মধ্যে এ পর্যন্ত তিনটা কার্গো চলে আসছে। ১১টার ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত হয়েছি।”
ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ
বর্তমানে বছরে পনের লক্ষ টন ক্রুড পরিশোধন করে ডিজেল, পেট্রোল, কেরোসিন, ফার্নেস অয়েল ন্যাপথা ও বিটুমিনসহ প্রায় ১৬ ধরনের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য উৎপাদন করে।
বাংলাদেশে মোট তেলের চাহিদার প্রায় কুড়ি শতাংশ পূরণ করে এই রিফাইনারি। ইস্টার্ন রিফাইনারি মধ্যপ্রাচ্যের উন্নত মানের ক্রুড ছাড়া অন্যান্য দেশের ক্রুড তেল পরিশোধন করতে পারে না। যে কারণে রাশিয়া বা ভেনেজুয়েলা বা অন্যান্য উৎস থেকে হেভি ক্রুড আমাদানি করে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করা সম্ভব নয়।

ছবির উৎস,Getty Images
রিফাইনারির এ প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান এবং এর উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ হিসেবে ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ করবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। ১৯৬৮ সালে নির্মিত তেল শোধনাগারটির সক্ষমতা দ্বিগুন বাড়ানো এবং আধুনিকায়ন করতে নিজস্ব অর্থায়নে ৩১ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে।
ইআরএল আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বছরে ৪৫ লাখ টন ক্রুড পরিশোধন করা সক্ষমতা তৈরি হবে।
বিপিসি চেয়ারম্যান বিবিসি বাংলাকে বলেন, বর্তমান যেটা আছে, এটা অনেক পুরোনো হওয়াতে হাই কোয়ালিটি ক্রুড ছাড়া এটা রিফাইন করতে পারে না।
“প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বাজার অনেক বৃদ্ধি পাবে। আমরা যেকোনো ধরনের ক্রুড রিফাইন করতে পারবো। এটা অনেক বড় অ্যাডভান্টেজ। আমরা অনেক সস্তা ক্রুড কিন্তু আছে, আমরা আনতে পারি না। কারণ আমাদের এই ইআরএল এ ম্যাচিং হয় না। যে কারণে ইআরএল টু অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
বিপিসির দাবি ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ হলে তেল উৎপাদন দ্বিগুন বাড়বে। দেশের মোট তেলের অর্ধেক চাহিদা পূরণ করতে পারবে। পরিশোধিত তেলের বিপরীতে আমদানিতে ব্যারেল প্রতি ১৮ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় হবে। তেলের মজুত ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে।
তবে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি পরিস্থিতির বিবেচনায় ইআরএল সক্ষমতা বৃদ্ধি কতটা লাভজনক হবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, একটা করতে পারে যেহেতু আমাদের ইস্টার্ন রিফাইনারি অনেক পূরাতন হয়ে গেছে, এটা হয়তো সময় এসে গেছে আর কিছুদিন চালিয়ে এটা বন্ধ করে দেয়া। যদি বন্ধ করে দেয়, তাহলে আমাদের ডাবল ক্যাপাসিটি হলো। তখন তাহলে সেটা হয়তো খুব খারাপ হবে না।
“অনেকে ভাবছে যে একটা রিফাইনারি থাকলে ওটার মধ্যেতো কিছুটা স্টক থাকে। ক্রুড অয়েলের স্টক আছে সেটা সাপ্লাইয়ে সাহায্য করে। কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে হবে যে আমাদের সবকিছু ইমপোর্টেড। আমাদের ক্রুডটা ইমপোর্টেড, ডিজেলও ইমপোর্টেড। এর মধ্যে একটাই সুবিধা যে শোধন করে সাপ্লাইটা ঠিক রাখলাম প্রাইসটাও ঠিক রাখলাম। কিন্তু আমি কোনো স্টাডি দেখানি বা হিসাব দেখি নাই যে আমাদের ওই ধরনের লাভ” বলেন ইজাজ হোসেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলছেন, এই মুহূর্তে আরেকটা রিফাইনারি আমাদের জন্য কতটুকু লাভজনক হবে, সেটা আমি নিশ্চিত না। দ্বিতীয় রিফাইনারি আজকে থেকে পনের বছর বিশ বছর আগে যদি করা যেত, সেটা আমাদের জন্যে অত্যন্ত লাভজনক হতো।
“অবশ্যই আরেকটা রিফাইনারি হলে ভালো হতো কিন্তু রিফাইনারির অনেকগুলো পণ্য উৎপাদন করে। যেগুলো ডিজেল ফোকাসড প্রোডাকশন, সেগুলো প্রায় ৪০ শতাংশ ডিজেল উৎপাদন করে। কিন্তু বাকী ষাট শতাংশের মধ্যে কেরোসিন, জেট অয়েল, পেট্রোল, ফার্নেস অয়েল, নাপথা- এরকম আরো অনেক প্রডাক্ট আছে। তো সেই প্রোডাক্টের পূর্ণ ব্যবহার কিন্তু আমাদের দেশে নাই। বিশেষ করে পট্রোল আমরা পূর্ণ ব্যবহার করতে পারি না। আরেকটা রিফাইনারির আসলে যে অতিরিক্ত পেট্রোল আসবে, সেটা আবার দেখা যাবে আমাদের রপ্তানিতে যেতে হবে।”
অর্থনীতি বিশ্লেষণ এবং জ্বীবাস্ম জ্বালানির বিরোধীতা থেকে এ ধরনের প্রকল্পের সমালোচনাও রয়েছে। সিপিডির গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এই টাকা বিনিয়োগ করলে বেশি সুফল আসবে বলে তিনি মনে করেন। কারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর হলে ইস্টার্ন রিফাইনারি এখন যে ক্যাপাসিটিতে আছে, এটাই ভবিষ্যতে একসময় উদ্বৃত্ব ক্যাপাসিটি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।।
তিনি বলেন, “ফসিল ফুয়েলের দীর্ঘমেয়াদী একটা কাঠামোতে যাওয়া এটা আর্থিক নির্ভরতা তৈরি করবে। ঋণের পরিমাণ সরকারের আরো বাড়াবে। একই সাথে যেটা হবে যখন এ ধরনের একটা বড় ক্যাপাসিটিতে আপনি যাবেন, তখন জীবাস্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার ব্যাপারে অনাগ্রহ তৈরি হবে।”


