শিল্পী আছে শিল্প নেই, নির্বাচন আছে হল নেই: অন্তহীন সংকটে এফডিসি

বিনোদন প্রতিবেদক 

প্রকাশিত: ২৭ জুন, ২০২৬

ঢাকা: “এফডিসিতে এখন শিল্পী আছে কিন্তু সিনেমা ‘শিল্প’ নেই। সারা বছর এখানে শুধুই নির্বাচনের আমেজ থাকে, কিন্তু চলচ্চিত্র উন্নয়নের কোনো বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেই।”— ক্ষোভ আর হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের এক প্রবীণ নির্মাতা।

এক সময় রুপালি পর্দার স্বপ্ন বোনার যে কারখানায় দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের আওয়াজ শোনা যেত, সেই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি) এখন যেন এক উৎসবমুখর ‘নির্বাচনী ক্লাব’। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সিনেমা নির্মাণ, হলের সংখ্যা বাড়ানো কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারের চেয়ে এফডিসিকেন্দ্রিক সমিতিগুলোর রাজনীতি ও ক্ষমতার চেয়ার দখলের লড়াই-ই এখন প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সারা বছর নির্বাচন, সিনেমার দেখা নেই

বিগত কয়েক বছরের এফডিসির চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বছরজুড়েই কোনো না কোনো সমিতির (পরিচালক, শিল্পী, প্রযোজক বা টেকনিশিয়ান) নির্বাচন নিয়ে সরগরম থাকে এই প্রাঙ্গণ। কাদা ছোড়াছুড়ি, প্যানেল পরিচিতি আর ভোট চাওয়ার মিছিলে মুখর থাকে চারপাশ। কিন্তু ভোটের উৎসব শেষ হতেই এফডিসি আবার ফিরে যায় তার চেনা নিস্তব্ধতায়।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, যেখানে বছরে শতাধিক মানসম্মত বাণিজ্যিক সিনেমা নির্মাণ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন হাতেগোনা কয়েকটি সিনেমা আলোর মুখ দেখছে। ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মের জোয়ারে কিছু ভালো কাজ হলেও, মূলধারার সিনেমা হলের জন্য এফডিসির অবদান এখন তলানিতে।

হল সংকটে ধুঁকছে চলচ্চিত্র

‘সিনেমা আছে তো হল নেই’— এই বাস্তবতাই এখন ঢাকাই সিনেমার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। এক সময় দেশে এক হাজারেরও বেশি প্রেক্ষাগৃহ সচল থাকলেও, বর্তমানে নিয়মিত সচল হলের সংখ্যা ১০০-র নিচে নেমে এসেছে।

চলচ্চিত্রের অংশীজনদের বক্তব্য: সাধারণ হলগুলোর আধুনিকায়ন না হওয়া এবং একের পর এক মাল্টিপ্লেক্সের টিকিটের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ দর্শক সিনেমা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। প্রযোজকরা লগ্নি ফেরত না পাওয়ার আশঙ্কায় নতুন বড় বাজেটের সিনেমা বানাতে সাহস পাচ্ছেন না। অথচ এফডিসি বা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট শীর্ষ সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে হল বাঁচানোর বা নতুন হল তৈরির কোনো কার্যকর ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না।

উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের নামে স্থবিরতা

ডিজিটাল যুগে এসেও এফডিসির কারিগরি সুযোগ-সুবিধা আধুনিক সিনেমার মানদণ্ড অনুযায়ী অনেকটাই পিছিয়ে। পোস্ট-প্রোডাকশন, কালার গ্রেডিং বা সাউন্ড মিক্সিংয়ের জন্য নির্মাতাদের এখনও বেসরকারি স্টুডিও কিংবা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এফডিসির আধুনিকায়নের জন্য বিভিন্ন সময়ে সরকারি বাজেট ও প্রকল্প এলেও, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সঠিক দূরদর্শিতার অভাবে তার সুফল সাধারণ নির্মাতারা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

সিনেমার এই ক্রান্তিকালে ইন্ডাস্ট্রি বাঁচাতে হলে শুধু সমিতিভিত্তিক রাজনীতি ও উৎসবের গণ্ডি থেকে বের হতে হবে। এফডিসিকে সত্যিকারের কর্মমুখর করার পাশাপাশি সিনেমা হলের সংখ্যা বাড়ানো, সরকারি অনুদানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নতুন মেধা তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানোই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 8   +   9   =