লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি, দৈনিক পূর্বাচল
২৬ জুন ২০২৬
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও ৩ মেয়েকে ঘরের ভেতর নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন সাহসী প্রতিবেশী রানী। জানুন ঘটনার বিস্তারিত এবং ঘাতকের পরিচয়।
রায়পুর (লক্ষ্মীপুর): লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে ঘরের ভেতর কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় স্তব্ধ পুরো এলাকা। নিহতদের স্বজন ও প্রতিবেশীদের বুকফাটা কান্নায় রায়পুরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এমন বীভৎসতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না প্রতিবেশী আফরোজা বেগম রানী। তীব্র আক্ষেপ আর গ্লানি নিয়ে তিনি বলেন, “একে একে চারটি তাজা প্রাণ চোখের সামনে চলে গেল, অথচ আমি পাশের বাড়ির একটা মানুষকেও রক্ষা করতে পারলাম না!”
যেভাবে খুনিকে আটকে দিলেন সাহসী রানী
গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নদীর পাড় এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঘটনার সময় পাশের বাসা থেকে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিৎকার শুনে ছুটে যান আফরোজা বেগম রানী। জানালার পাশে গিয়ে গৃহকর্ত্রী শাহিনুর বেগমকে ডাকলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি।
কিছুক্ষণ পর রানী দেখেন ঘরের ভেতর এক অপরিচিত যুবক হাতে প্যান্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রায়পুরে আসার কারণ জানতে চাইলে যুবকটি জানায়, সে পাইপলাইন মেরামতের কাজ করতে এসেছে। কিন্তু যুবকের আচরণে তীব্র সন্দেহ হওয়ায় রানী বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বাইরে থেকে ঘরের প্রধান ফটকটি আটকে দেন এবং চিৎকার করে প্রতিবেশীদের ডাকেন।
ঘরের ভেতর রক্তগঙ্গা, ছাদ থেকে খুনিকে ধরে গণপিটুনি
রানীর চিৎকারে স্থানীয়রা জড়ো হয়ে তালা খুলে ঘরের ভেতর প্রবেশ করতেই এক বীভৎস দৃশ্য দেখতে পান। পুরো ঘরের মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল এবং প্রত্যেকের শরীরেই ছিল ধারালো অস্ত্রের একাধিক নির্মম আঘাত।
জনতাকে ঘরের ভেতর ঢুকতে দেখে অভিযুক্ত যুবক চটজলদি বাসার ছাদে গিয়ে আশ্রয় নেয়। তবে ততক্ষণে ক্ষুব্ধ জনতা ছাদে উঠে তাকে ধরে গণপিটুনি দেয়। পরবর্তীতে গণপিটুনির শিকার হয়ে ওই যুবকেরও মৃত্যু হয়।
এক দুর্ঘটনায় সব শেষ, পরিবারটির করুণ ইতিহাস
নিহত শাহিনুর বেগমের স্বামী কামাল হোসেন ২০১৯ সালে এক মর্মান্তিক বিদ্যুৎ দুর্ঘটনায় মারা যান। এরপর থেকে এই সজ্জন ও সংগ্রামী পরিবারটিকে স্থানীয়রা অনেক ভালোবাসতেন। পরিবারের সন্তানেরাও ছিল অত্যন্ত মেধাবী।
বড় মেয়ে সায়মা আক্তার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছিল। মেজো মেয়ে ইকরা আক্তার লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার মার্চেন্টস একাডেমিতে পড়ত। একমাত্র ছেলে সিফাত রায়পুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার পাশাপাশি চাকরি করে সংসারের হাল ধরেছিল।
নিহতদের আদি বাড়ি কুমিল্লায়। অন্যদিকে, গণপিটুনিতে নিহত ঘাতক অন্তর মজুমদারের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। সে একসময় ওই ভবনেরই ভাড়াটিয়া এবং রায়পুরে ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা ছিল বলে জানা গেছে।

