স্বাধীন বাংলা বেতারের শব্দসৈনিক কামাল লোহানীর জন্মবার্ষিকী: এক কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

কালচারাল ডেস্ক | 

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বাঙালি জাতি তখন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে। ঠিক সেই মুহূর্তে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে যাঁর বজ্রকণ্ঠে প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার সেই কাঙ্ক্ষিত মহা সুসংবাদ—তিনি আর কেউ নন, আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম ছায়াবৃক্ষ, সর্বজন শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানী। আগামী ২৬শে জুন স্বাধীন বাংলাদেশের এই অনন্য শব্দসৈনিকের জন্মবার্ষিকী।

কামাল লোহানী একাধারে এদেশের প্রথিতযশা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ভাষা সংগ্রামী, বরেণ্য সাংবাদিক এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ১৯৩৪ সালের ২৬শে জুন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার সনতলা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ‘কামাল লোহানী’ নামে দেশজুড়ে সমাদৃত হলেও তাঁর পুরো নাম আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। তাঁর পিতা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী এবং মাতা রোকেয়া খান লোহানী।

ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ

তাঁর পুরো জীবনটাই ছিল এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তৎকালীন পাকিস্তানি শোষকদের বিরুদ্ধে দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক ও সামাজিক গণ-আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে ছিলেন তিনি, যার খেসারত হিসেবে কারাবরণও করতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। তবে ১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বে অনন্য অবদান

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ‘দৈনিক মিল্লাত’ পত্রিকা দিয়ে সাংবাদিকতার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার শুরু করেন কামাল লোহানী। এরপর তিনি আজাদ, সংবাদ, পূর্বদেশ এবং দৈনিক বার্তার মতো ঐতিহ্যবাহী ও শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (DUJ) সভাপতি হিসেবেও নেতৃত্ব দেন।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাঁর অবদান ছিল আকাশচুম্বী। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দুই মেয়াদে সফলভাবে মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এছাড়া প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’-এর সম্পাদক হিসেবে চার বছর দায়িত্ব পালনসহ বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিয়েছেন। আমৃত্যু তিনি উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা হিসেবে প্রগতিশীল চেতনার বাতিঘর হয়ে ছিলেন।

২০২০ সালের ২০শে জুন বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে ৮৫ বছর বয়সে এই মহীরুহ পরলোকগমন করেন। দেশ ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর এই অসামান্য অবদান বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 7   +   2   =