রূপগঞ্জে বেনজীরের জব্দ বাড়ি: ২ বছর বেতনহীন কেয়ারটেকারের মানবেতর জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)

প্রকাশের তারিখ: ১৮ জুন, ২০২৬

রূপগঞ্জ:নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের জব্দকৃত ডুপ্লেক্স বাড়ির কেয়ারটেকার রতন মিয়া দুই বছর ধরে বেতন না পেয়ে পরিবার নিয়ে চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। দুদকের মামলার পর থেকে আইনি জটিলতা ও আর্থিক বরাদ্দের অভাবে এই মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

ক্ষমতার দাপটে দেশজুড়ে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় তার সেই বিপুল সম্পত্তি এখন রাষ্ট্রীয় হেফাজতে। তবে এই আইনি প্রক্রিয়ার যাঁতাকলে পড়ে চরম মানবিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত তার আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ির একমাত্র কেয়ারটেকার রতন মিয়া। দীর্ঘ দুই বছর ধরে কোনো বেতন না পেয়ে বর্তমানে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।

আদালত কর্তৃক বাড়িটি ক্রোক করা হলেও গত ৬ মাস ধরে সেখানে সরকার পক্ষের কোনো নিরাপত্তা কর্মী নেই। ফলে একদিকে চুরির ভয়, অন্যদিকে দুদকের তালিকায় নিজের নাম-আইডি কার্ড থাকায় আইনি জটিলতার আশঙ্কায় বাড়িটি ছাড়তেও পারছেন না অসহায় এই কেয়ারটেকার। এককালীন বকেয়া পারিশ্রমিক পাওয়ার স্বপ্ন নিয়েই দিনরাত পাহারা দিয়ে যাচ্ছেন এই বিশাল অট্টালিকা।

দিনমজুর থেকে বিলাসবহুল বাড়ির পাহারাদার

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার হরিরামপুর গ্রামের খাইরুল বাশারের ছেলে রতন মিয়া প্রায় দেড় যুগ আগে কাজের সন্ধানে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আসেন। দীর্ঘ সময় বিভিন্ন স্থানে দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার পর, প্রায় চার বছর আগে এই ডুপ্লেক্স বাড়িটির নির্মাণকাজের শুরু থেকেই তিনি এখানে যুক্ত হন। পরবর্তীতে ২০২২ সালের দিকে মাসিক ১৫ হাজার টাকা বেতনে তাকে বাড়িটির সার্বিক দেখভালের জন্য কেয়ারটেকার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

মামলা, ক্রোক ও বেতনহীন ২ বছর

২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের হিসাব গোপন ও অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা দায়ের করে দুদক। এর আগে, একই বছরের ২৬ মে আদালতের নির্দেশে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ১১৯টি জমির দলিল, ২৩টি কোম্পানির শেয়ার, গুলশানের ৪টি ফ্ল্যাটসহ মোট ৬২৭ বিঘা জমি ক্রোকের আদেশ দেওয়া হয়। রূপগঞ্জের এই আনন্দ হাউজিং সোসাইটি এলাকার ২৪ কাঠা জমির ওপর নির্মিত বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাংলোটিও এই ক্রোক তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আদালতের আদেশের পর বাড়িটি পুরোপুরি রাষ্ট্রের অধীনে চলে যায় এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) এর সার্বিক দেখাশোনার জন্য রিসিভার হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর কিছুদিন সরকারিভাবে রতন মিয়ার সাথে একজন নিরাপত্তাকর্মী দেওয়া হলেও চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে সেই নিরাপত্তাকর্মী দেওয়া বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। তবে বিশাল এই ডুপ্লেক্স বাড়িটি এখনো সরকারি হেফাজতেই রয়েছে।

ভয় আর অনিশ্চয়তায় কাটছে দিন

কেয়ারটেকার রতন মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,

“২০২২ সাল থেকে আমি ১৫ হাজার টাকা বেতনে কাজ শুরু করি। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের পর থেকে আমার বেতন পুরোপুরি আটকে যায়। প্রায় দুই বছর হতে চলল আমি কোনো টাকা পাই না। আমাদের তিনজনের সংসার, ছেলেটা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। এখন আমার স্ত্রী বাড়িতে কুটির শিল্পের কাজ করে যা পায়, তা দিয়েই কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে।”

বাড়ি ছেড়ে না যাওয়ার কারণ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন,

“পরিবার নিয়ে চরম কষ্টে থাকলেও ভয়ে এই বাড়িটি ছাড়তে পারছি না। মালিকের সম্পদ নিয়ে ঝামেলা হওয়ার পর এই বাড়িতে দুদকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসেছিলেন। তারা আমার ছবি ও আইডি কার্ডের কপি নিয়েছেন। আমি এখন চলে গেলে যদি এই রাষ্ট্রীয় সম্পদের কোনো ক্ষতি বা চুরি হয়, সেই ভয়েই দায়িত্ব আঁকড়ে পড়ে আছি। আশা করছি সরকার আমার বকেয়া বেতনটার একটা ব্যবস্থা করবে।”

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 9   +   10   =