জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) প্রতিনিধি
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে ১০ বছরের এক এতিম শিশুকে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার আশ্বাসে বাসায় এনে দীর্ঘ দুই বছর ধরে গৃহকর্মীর মতো খাটানো এবং শারীরিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ উঠেছে এক কলেজ শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী মরিয়ম (১০) অভিযোগ করেছে, তাকে দত্তক নেওয়ার কথা বলে আশ্রয় দেওয়া হলেও পরে তার লেখাপড়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ঘরের প্রায় সব কাজ করানো হতো এবং সামান্য ভুল হলেই তার ওপর চালানো হতো নির্মম নির্যাতন।
অভিযুক্ত লাবনী জীবননগর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও স্থানীয় ব্যবসায়ী-ঠিকাদার জাকাউল্লাহর কন্যা। তিনি জীবননগর সরকারি মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মরিয়মের বয়স যখন মাত্র ছয় বছর, তখন তার মা মারা যান। পরে বাবা অন্যত্র চলে গেলে শিশুটি নানা-নানির কাছে বড় হতে থাকে। দুই বছর আগে নানার মৃত্যুর পর মরিয়মকে নিজের বাসায় নিয়ে যান লাবনী। পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল, শিশুটির লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়া হবে এবং তাকে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করা হবে।
কিন্তু পরিবারের দাবি, কিছুদিন স্কুলে পাঠানোর পর তার পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই তাকে দিয়ে ঘর মোছা, রান্না, কাপড় ধোয়া, বাসন মাজাসহ সংসারের বিভিন্ন কাজ করানো হতো।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কাজে সামান্য ভুল হলেই মরিয়মের ওপর নেমে আসত শারীরিক নির্যাতন। কখনো লাঠি, কখনো রড, আবার কখনো গরম খুন্তি দিয়ে তাকে আঘাত করা হতো। এতে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত ও আঘাতের চিহ্ন তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৬ জুন গৃহস্থালির কাজে সামান্য ত্রুটিকে কেন্দ্র করে শিশুটির ওপর আবারও নির্যাতন চালানো হয়। তাকে মারধর করে আহত করা হয় এবং একপর্যায়ে পেটে লাথি মারা হলে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। জ্ঞান ফেরার পর সুযোগ বুঝে পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেয়। পরে প্রতিবেশীদের মাধ্যমে খবর পেয়ে তার নানি এসে তাকে উদ্ধার করেন।
নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মরিয়ম বলে, “আমাকে পড়াশোনা করানোর কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে সব কাজ আমাকে দিয়ে করানো হতো। কোনো কাজ ভুল হলেই মারধর করত। আমি কাঁদলে মুখে কাপড় গুঁজে দেওয়া হতো যাতে কেউ শুনতে না পায়। গত দুই বছর ধরে আমার ওপর এভাবেই নির্যাতন করা হয়েছে।”
মরিয়মের নানি রশিদা খাতুন বলেন, “এতিম একটি শিশুর সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমার নাতনির শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। আমি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত শিক্ষিকা লাবনীর সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান মেয়েটি আমার কাছে চার বছর ধরে আছে আমি নিজের সন্তানের মতকরে তাকে লালন পালন করি। নিজের মেয়ে হলে কি শাসন করা যায় না। আমি তাকে শাসন করেছি আমার রাগ হয়ে যাওয়াই আমি তাকে মেরেছি খুব বেশি মারিনি।
জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোলায়মান শেখ বলেন, “এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।

