নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
গ্যাস ও যাতায়াত খরচের বাড়তি চাপের মধ্যেই মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের পকেটে নতুন ধাক্কা দিলো বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, যা চলতি বছরের ১ জুন ২০২৬ থেকেই কার্যকর হয়েছে।
হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধিতে ঢাকার বনশ্রীর গৃহিণী তানিয়া রহমানের মতো লাখো গ্রাহক এখন উদ্বিগ্ন। কারোর মাসিক গড় বিল ২,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ২,৫০০ টাকা হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এই বাড়তি বিলের সুনির্দিষ্ট হিসাব জানতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে আপনার বাসায় প্রতি মাসে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে।
বিদ্যুতের ‘ইউনিট’ ও মিটারের হিসাব
সহজ কথায়, ১ ইউনিট বিদ্যুৎ মানে ঘণ্টায় ১ কিলোওয়াট (১,০০০ ওয়াট) বিদ্যুৎ ব্যবহার। অর্থাৎ, ১,০০০ ওয়াটের একটি এসি বা আয়রন যদি ১ ঘণ্টা চলে, তবে ১ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হবে। একইভাবে, ১০০ ওয়াটের একটি বাল্ব ১০ ঘণ্টা জ্বললে বা ৫০ ওয়াটের একটি ফ্যান ২০ ঘণ্টা চললেও ঠিক ১ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হবে।
আপনার মাস শেষে ব্যবহৃত মোট ইউনিট জানতে কারেন্টের মিটারের বর্তমান রিডিং থেকে আগের মাসের রিডিং বাদ দিতে হবে। যেমন—গত মাসের রিডিং যদি ১২,২০০ থাকে এবং বর্তমান রিডিং ১২,৫০০ দেখায়, তবে আপনার এ মাসের ব্যবহার ৩০০ ইউনিট।
স্বস্তি প্রান্তিক গ্রাহকদের: ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত দাম বাড়েনি
নতুন দাম ঘোষণার মাত্র এক দিনের মাথায় (৪ জুন) বিদ্যুৎ বিভাগের অনুরোধে বিইআরসি নিম্ন ও প্রান্তিক আয়ের গ্রাহকদের স্বার্থে একটি সংশোধনী এনেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আবাসিকে লাইফলাইন (০-৫০ ইউনিট) এবং প্রথম ধাপের (০-৭৫ ইউনিট) গ্রাহকদের জন্য বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের ক্ষেত্রে আগের দামই বহাল থাকছে।
আবাসিক গ্রাহকদের নতুন ধাপ ও ইউনিটভিত্তিক মূল্যহার:
| গ্রাহক শ্রেণি ও ধাপ (স্ল্যাব) | পূর্বের মূল্য (প্রতি ইউনিট) | বর্তমান নতুন মূল্য (প্রতি ইউনিট) |
| লাইফলাইন (০ থেকে ৫০ ইউনিট) | ৪.৬৩ টাকা | ৪.৬৩ টাকা (অপরিবর্তিত) |
| প্রথম ধাপ (০ থেকে ৭৫ ইউনিট) | ৫.২৬ টাকা | ৫.২৬ টাকা (অপরিবর্তিত) |
| দ্বিতীয় ধাপ (৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট) | ৭.২০ টাকা | ৮.৫০ টাকা |
| তৃতীয় ধাপ (২০১ constructions থেকে ৩০০ ইউনিট) | ৮.০৮ টাকা | ৯.৫৯ টাকা |
| চতুর্থ ধাপ (৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট) | ৮.০২ টাকা | ৯.৬২ টাকা |
| পঞ্চম ধাপ (৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট) | ১২.৬৭ টাকা | ১৫.০১ টাকা |
| ষষ্ঠ ধাপ (৬০০ ইউনিটের ওপরে) | ১৪.৬১ টাকা | ১৭.৩৫ টাকা |
আপনার বিল যেভাবে হিসাব করবেন (মাল্টিপল স্ল্যাব নিয়ম)
অনেকেই মনে করেন ৩০০ ইউনিট ব্যবহার করলে পুরো ৩০০ ইউনিটের দামই বুঝি ৯.৫৯ টাকা করে আসবে। বিষয়টি আসলে তেমন নয়। বিদ্যুৎ বিল হিসাব করা হয় ‘মাল্টিপল স্ল্যাব’ বা ধাপে ধাপে। আপনি যখনই ৭৫ ইউনিটের সীমা পার করবেন, তখন আপনার বিলটি ভেঙে ভেঙে বিভিন্ন স্ল্যাবে ঢুকবে।
ধরা যাক, তানিয়া রহমানের বাসায় এ মাসে ৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে। তবে তার বিলের হিসাব হবে ৩টি ধাপে:
-
প্রথম ৭৫ ইউনিটের জন্য: ৭৫ × ৫.২৬ টাকা = ৩৯৪.৫০ টাকা
-
পরবর্তী ১২৫ ইউনিটের জন্য (৭৬-২০০ স্ল্যাব): ১২৫ × ৮.৫০ টাকা = ১,০৬২.৫০ টাকা
-
অবশিষ্ট ১০০ ইউনিটের জন্য (২০১-৩০০ স্ল্যাব): ১০০ × ৯.৫৯ টাকা = ৯৫৯.০০ টাকা
-
মোট এনার্জি কস্ট: ২,৪১৬ টাকা (এর সাথে মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ ও ৫% ভ্যাট যুক্ত হয়ে চূড়ান্ত বিল তৈরি হবে)।
বিইআরসি’র কর্মকর্তাদের মতে, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ যত উপরের স্ল্যাবে যাবে, বিলের ওপর চাপের হারও তত ঐকিক নিয়মে বাড়তে থাকবে। তাই এই বাড়তি খরচের মাসে বিল নিয়ন্ত্রণে রাখতে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সাশ্রয়ী ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।

