মিরপুরে ৭ দিন পর উদ্ধার বৃদ্ধার সন্তানরা যুগ্মসচিব ও বুয়েট শিক্ষক

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা: রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে মৃতাবস্থায় উদ্ধারের সাত দিন পর অবশেষে হতভাগ্য বৃদ্ধা নূরজাহান বেগমের (৭৫) চার সন্তানের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও অনুসন্ধানী সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, মৃত নূরজাহান বেগমের তিন ছেলে ও এক মেয়ে প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নূরজাহান বেগমের বড় ছেলে ড. এ কে এম আনিসুর রহমান বাংলাদেশ সরকারের একজন যুগ্মসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। বর্তমানে তিনি মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষে কর্মরত রয়েছেন। শিক্ষাজীবনে অত্যন্ত মেধাবী এই কর্মকর্তা ১৯৮৬ সালে মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৮৮ সালে ঢাকা কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর ড. আনিসুর রহমান পরিকল্পনা কমিশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কেডিআই স্কুল অব পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ থেকে এমপিপি ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ‘সরকারি কর্মচারী হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ’ প্রকল্পের উপ-পরিচালক হিসেবেও দায়িত্বরত আছেন।

নূরজাহান বেগমের দ্বিতীয় ছেলে ড. এ কে এম আশিকুর রহমান দেশের একজন খ্যাতিমান প্রকৌশলী ও শিক্ষক। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত এবং বেসরকারি প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি। তিনি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ৩২তম ব্যাচের প্রাক্তন ক্যাডেট। ১৯৮৯ সালে এসএসসি এবং ১৯৯১ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি। ১৯৯৮ সালে বুয়েট থেকে সিএসই বিষয়ে বিএসসি এবং ২০০১ সালে এমএসসি সম্পন্ন করার পর কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা থেকে কম্পিউটিং সায়েন্সে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

পরিবারের একমাত্র কন্যা ফাতিমা নাসরিন সুলতানা মিরপুরের ইম্পেরিয়াল স্কুলের শিক্ষিকা। নূরজাহান বেগম মিরপুর-১১ নম্বরের ৬ নম্বর সেকশনের এই মেয়ের বাসাতেই একটি কক্ষে থাকতেন। নূরজাহানের ছোট ছেলে কে এম আতিকুর রহমান বর্তমানে কানাডা প্রবাসী; তার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।

গত রোববার (১ জুন) রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল পেয়ে পল্লবী থানা পুলিশ ওই ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ থেকে নূরজাহান বেগমের পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশের ধারণা, উদ্ধারের অন্তত সাত থেকে আট দিন আগে ওই বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে।

ঘটনাস্থলে যাওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, বৃদ্ধা নূরজাহান বেগম যে কক্ষটিতে থাকতেন, সেটি ছিল চরম নোংরা, অপরিচ্ছন্ন এবং আবর্জনা ও উইপোকায় ভরা। কক্ষের ভেতরের পরিবেশ দেখে স্পষ্ট বোঝা গেছে যে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি চরম অবহেলা, অযত্ন ও পরিচর্যার অভাবে ভুগছিলেন। পাশে অন্য কক্ষে মেয়ে থাকলেও তিনি মায়ের কোনো খোঁজ নেননি। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে বুয়েট শিক্ষক মেজো ছেলে মরদেহ নিতে এলেও, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বড় ছেলে আসেননি বলে জানা গেছে।

সমাজে চরম অবহেলার শিকার এই মায়ের ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সন্তানরা মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত হলেই যে প্রকৃত মানুষ হতে পারে না—এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সমাজে চোখে আঙুল দিয়ে তাই প্রমাণ করলো।

ঢাকা, বুধবার, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (৩ জুন, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ)

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 6   +   4   =