অনলাইন জুয়ার মরণফাঁদ: সর্বস্বান্ত লাখো মানুষ, পাচার হচ্ছে হাজার কোটি টাকা

সোহেল হাওলাদার, দৈনিক পূর্বাচল

একসময় জুয়া মানে ছিল তাসের আড্ডা কিংবা অন্ধকার ঘরের গোপন আসর। কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহারে সেই জুয়া এখন চলে এসেছে হাতের মুঠোয়, স্মার্টফোনের পর্দায়। মোবাইল অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন আর বিকাশ-নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ভয়ংকর অনলাইন বেটিং সিন্ডিকেট। কিশোর থেকে বৃদ্ধ— সব বয়সি মানুষ জড়িয়ে পড়ছে এ ভয়ংকর নেশায়। বাদ থাকছে না স্কুলের শিক্ষার্থীরাও। এতে কেউ হারাচ্ছেন ব্যবসার মূলধন, কেউ বসতভিটা, আবার কেউ সর্বস্ব হারিয়ে বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ। দৈনিক পূর্বাচল-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনলাইন জুয়া শুধু লাখো মানুষকে সর্বস্বান্তই করছে না, এর মাধ্যমে দেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা।

দেশজুড়ে আত্মহনন ও অপরাধের চিত্র দৈনিক পূর্বাচল-এর অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় অনলাইন জুয়ার এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জুয়ার কারণে আত্মহত্যা, খুন, চুরি, ছিনতাই, ঋণগ্রস্ততা ও পারিবারিক ভাঙনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফুটপাতের দোকানি, সিএনজিচালক, নির্মাণশ্রমিক, কলেজশিক্ষার্থী, গৃহপরিচারিকা থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পর্যন্ত অনেকেই এখন নিয়মিত জড়াচ্ছেন এই মরণফাঁদে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিকে৪৪৪ (CK444), সিভি৬৬৬ (CV666), নগদ৮৮ (Nagad88), ক্রিক্রিয়া (Crickya), ওয়ানএক্সবেট (1xBet), বাবু৮৮ (Babu88), লাইনবেটসহ (Linebet) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বেটিং অ্যাপ ব্যবহার করে চলছে জুয়ার আসর। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মাধ্যমে সহজে টাকা জমা (ক্যাশ ইন) ও উত্তোলনের (ক্যাশ আউট) সুযোগ থাকায় এই আসক্তি দ্রুত মহামারি আকার ধারণ করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাত্র একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই যে কেউ যেকোনো প্রান্ত থেকে জুয়ার জগতে প্রবেশ করতে পারছে।

অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব হওয়া কক্সবাজার শহরের এক তরুণ ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আগে ডলার দিয়ে বা আন্তর্জাতিক কার্ড দিয়ে খেলতে হতো, তাই লোক কম ছিল। এখন বিকাশে বা নগদে টাকা পাঠালেই খেলা যায়। এত সহজ হওয়ার কারণেই লোভে পড়ে সবাই জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে।”

ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ, বাড়ছে খুন-সহিংসতা অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতা এখন আর কেবল আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অনলাইন জুয়ার নেশায় পড়ে এক সরকারি চাকরিজীবী এনজিও থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নেন। পুরো টাকাই জুয়ায় হারিয়ে পারিবারিক ও অর্থনৈতিক চাপে গত ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি আত্মহত্যা করেন। একই এলাকায় কলেজছাত্র হৃদয় মিয়া বন্ধুর কাছ থেকে ধার নেওয়া ২২ হাজার টাকা জুয়ায় হারিয়ে ফেলেন। সেই টাকা ফেরত না পেয়ে ক্ষুব্ধ বন্ধুরা তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

গত বছরের ৯ ডিসেম্বর কক্সবাজার পৌরসভার এসএম পাড়ার ইমরান (২৮) অনলাইন জুয়ার ঋণের চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এছাড়া বগুড়া ও যশোরে অনলাইন জুয়াকে কেন্দ্র করে খুন, আত্মহত্যা ও পারিবারিক সহিংসতার একাধিক ঘটনা ঘটেছে।

কক্সবাজারের পুলিশ… (সাবেক এসপি) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অনলাইন অপরাধ দমনে সব থানাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ভুক্তভোগী সামাজিক মর্যাদা বা আইনি জটিলতার ভয়ে অভিযোগ করতে চান না। স্থানীয়রা বলছেন, জুয়ার টাকা জোগাতে তরুণরা স্বর্ণালংকার বিক্রি, পরিবারের টাকা আত্মসাৎ এমনকি ছিনতাই ও চুরির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে। শুরুতে সামান্য লাভ দেখিয়ে অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করে, পরে বড় অঙ্কের লোভ দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে নিঃস্ব করে দেয়।

প্রযুক্তির অপব্যবহার ও এআই-এর ফাঁদ: অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনলাইন জুয়ার পেছনে রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী এক এজেন্ট সিন্ডিকেট। মাস্টার এজেন্ট, সাব-এজেন্ট ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে পুরো নেটওয়ার্ক। খেলোয়াড়রা হারলে নির্দিষ্ট হারে কমিশন পায় এই এজেন্টরা। দেশের বিভিন্ন জেলায় বসে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুক, ইউটিউব) বিজ্ঞাপন দিয়ে নতুন খেলোয়াড় সংগ্রহ করছে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এসব বিজ্ঞাপনে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করতে দেশের জনপ্রিয় সেলিব্রেটি বা খেলোয়াড়দের ‘এআই’ (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দ্বারা তৈরি ভুয়া বা ডিপফেক ভিডিও ব্যবহার করা হচ্ছে।

ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, অধিকাংশ বেটিং সার্ভার রাশিয়া, মালয়েশিয়া বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় মূল হোতাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সীমান্তবর্তী জেলা ও মেগা প্রজেক্টের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেশি— এমন এলাকাগুলোতে এ নেটওয়ার্ক বেশি সক্রিয়।

যেমন, মেহেরপুরে অনলাইন জুয়া রীতিমতো মহামারিতে রূপ নিয়েছে। কয়েক শ তরুণ বিভিন্ন অ্যাপের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। মুজিবনগর উপজেলায় অনলাইন জুয়ার অবৈধ টাকায় অনেকের জীবনযাত্রায় হঠাৎ রাতারাতি পরিবর্তন এসেছে। কেউ দোতলা বাড়ি করেছেন, কেউ বিলাসবহুল গাড়ি কিনেছেন, অথচ তাদের দৃশ্যমান কোনো বৈধ আয়ের উৎস নেই।

মেহেরপুরে অনলাইন জুয়ার ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিত কমরপুর গ্রামের নবাবকে একসময় গ্রেপ্তার করা হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি বিদেশে পাড়ি জমান। তার অনুপস্থিতিতে জুয়ার নেটওয়ার্কের নেতৃত্বে আসেন মোরশেদুল আলম লিপু গাজী। তিনিও গত বছর অক্টোবরে গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে একাধিক জেলায় অন্তত অর্ধডজন মামলা থাকলেও কয়েক মাসের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসেন তিনি। পুলিশ প্রশাসন জানাচ্ছে, প্রযুক্তির মাধ্যমে জুয়ার অ্যাপ বন্ধ করার কাজ চললেও মূল অপরাধীরা বিদেশে থাকায় তদন্ত কঠিন হচ্ছে।

মোবাইল ব্যাংকিং ও অর্থ পাচারের শঙ্কা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভয়ংকর এই জুয়ার নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় জ্বালানি হলো সহজ প্রযুক্তি ও দেশের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)। বিকাশ ও নগদের মতো সেবা ব্যবহার করে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো বড় বড় উন্নয়ন হাব, যেখানে টাকার প্রবাহ বেশি, সেখানেও অনলাইন জুয়ার হাট বেশ চাঙা। সেখানকার সাধারণ শ্রমিকরাও এতে আসক্ত হয়ে পড়ছেন।

বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশনস কর্মকর্তা শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম এ বিষয়ে জানান, অনলাইন জুয়া, হুন্ডি ও অর্থ পাচার ঠেকাতে তারা নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালাচ্ছেন। সন্দেহজনক লেনদেন বা অস্বাভাবিক ক্যাশ ইন-আউট শনাক্ত হলেই তারা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠান।

প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ সমাজবিজ্ঞানী ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ বা পুলিশি অভিযান দিয়ে এই মহামারি রোখা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা ও কঠোর প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ। বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরদের বাঁচাতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এখনই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে অনলাইন জুয়া অদূর ভবিষ্যতে দেশের জন্য এক ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করবে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 6   +   4   =