গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে এক অভাবনীয় বিরল দৃশ্যপট রচিত হয়েছে। এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে নির্বিঘ্নে হাঁটলেন, ঘুরলেন এবং হাজারো শিক্ষার্থীর পরম শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন। তাকে ঘিরে প্রাণোচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠল ক্যাম্পাস। গত ৫৪ বছরে কোনো প্রধানমন্ত্রীর এমন সৌভাগ্য হয়নি যে, নিরুপদ্রবে-নির্বিঘ্নে বিক্ষোভ রহিত পরিবেশে ক্যাম্পাসে পদার্পণ এবং ফিরতে পেরেছেন। যা গতকাল ঘটলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্ষেত্রে। তাকে পরমানন্দে বরণ করে নিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। হাজারো শিক্ষার্থী স্লোগানে মিছিলে ও করতালিতে স্বাগত জানাতে জড়ো হয়েছিলেন। সাড়ে তিন দশক পরে নিজের ক্যাম্পাসে ফিরতে পেরে উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন তারেক রহমান। ঢাকা ভার্সিটির ক্যাম্পাসে এ এক অভূতপূর্ব নজির রচনা করলেন তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক মেধাবী শিক্ষার্থী সালেহ শিবলী জানান, বেলা ১২টার কিছু আগে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন থেকে বের হয়ে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করেন। আমিও ছিলাম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে তো বটেই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সরকারপ্রধান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নির্বিঘ্নে হেঁটে অনুষ্ঠানে এসেছেন। এটা বিরল ঘটনা।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আরও বলেন, অতীতে আমরা দেখেছি যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো সরকারপ্রধান আসলে, কোনো প্রধানমন্ত্রী আসলে-প্রতিবাদ হয়েছে, পক্ষে-বিপক্ষে স্লোগান হয়েছে, সংঘর্ষের ঘটনারও দৃষ্টান্ত রয়েছে। আজকে দেখবেন সেইরকম কোনো দৃশ্য নেই। হাজারো শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রীকে দেখে রীতিমতো হুমড়ি খেয়ে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে। স্লোগানও হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়েছে, কেউ কেউ দূর থেকে প্রধানমন্ত্রীকে হাত নেড়ে স্বাগত জানাতে দেখা গেছে। সিনেট ভবনের সামনে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িও প্রস্তুত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হেঁটে যাওয়ার কথা বলেই হাঁটতে শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মীরাও হয়ে ওঠেন তৎপর। শিক্ষার্থীরা এভাবে প্রধানমন্ত্রীকে হেঁটে যেতে দেখে করতালি দেয়, অনেকে স্লোগানও দেয়।
অনুষ্ঠানটির আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী যতটুকু পথ হেঁটে এসেছেন, আপনি দেখবেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে কী উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা। এখানে নানা মতের ও আদর্শের শিক্ষার্থীর অবস্থান ছিল। কিন্তু তাদের রিঅ্যাকশনটা স্মরণীয়।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী দেড়শ শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে বিভিন্ন প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দেন। ৩৫ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কথা তুলে ধরে বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, মনে হচ্ছে প্রায় ৩৫ বছর আগে ফিরে গেছি। ইউজিসির প্রোগ্রামটা শেষ করার পরে আমাকে ওখানে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমি গাড়িতে যাব না হেঁটে। এত বছর পরে সেই ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে এসে আমার খুব ইচ্ছা ছিল হেঁটে একটু দেখতে দেখতে আসব। কিন্তু সে সৌভাগ্য হয়নি। বুঝতেই পারছেন কেন। ইনশাল্লাহ আরেকবার আসতে হবে।
ঘণ্টাব্যাপী মতবিনিময় সভার শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত শিক্ষার্থীদের বলেন, আপনারা কেমন আছেন সবাই। ভালো আছেন? আপনাদেরকে দেখে খুব ভালো লাগছে। নিজ ক্যাম্পাস লাইফের স্মৃতিচারণ করে এ সময় তিনি বলেন, মনে হচ্ছে আজকে থেকে ৩৫ বছর আগে ফিরে গেছি। এ সময় তিনি মিলনায়তনের বাইরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দিকে লক্ষ্য করে বলেন, বুঝতেই পারছেন, বাইরে দেখে আন্দাজ করতে পারছেন। ইনশা আল্লাহ ক্যাম্পাসে আরেকবার আসতে হবে।
ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ঢল
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সফর উপলক্ষে ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় ও মহানগর ইউনিটের নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো ক্যাম্পাস। সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, অপরাজেয় বাংলা, রাজু ভাস্কর্য, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নেতাকর্মীদের জড়ো হতে দেখা যায়। বিভিন্ন হল ও মহানগর ইউনিট থেকে ব্যানার, ফেস্টুন ও স্লোগানসহ মিছিল নিয়ে তারা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা জানান, প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে তারা সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়েছেন। অনেকেই এটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে উল্লেখ করেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও অতিরিক্ত নজরদারি চালানো হয়। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে সাজসজ্জার পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও বাড়ানো হয়।

