ডনাল্ড জে. ট্রাম্প ১৯৮৮ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যদি ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর হামলা করে, আমি খার্গ দ্বীপে কড়া ব্যবস্থা নেব। আমি সেখানে গিয়ে দখল করব।
প্রায় ৪০ বছর পরে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র একটি দ্বীপ- যাকে এখন ট্রাম্প ‘দেশের ক্রাউন জুয়েল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন, এর ভবিষ্যত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে উদ্ভাসিত হতে শুরু করেছে। সোমবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, শুধু একটাই শব্দ, আর পাইপলাইনগুলো শেষ। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র যখন সেখানে সামরিক স্থাপনাগুলো বোমা মেরেছে, তখনও আমি পুনরায় খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামোর ওপর হামলার হুমকি দিয়েছি। এটি পুনর্গঠন করতে অনেক সময় লাগবে। অনলাইন নিউইয়র্ক টাইমস এ খবর দিয়েছে।
পারস্য উপসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত এই ছোট দ্বীপ একটি আকর্ষণীয় লক্ষ্য। বিশেষ করে এমন একজন প্রেসিডেন্টের জন্য যিনি প্রায়ই বলেছেন, যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে তেল সম্পদ রক্ষা করতে হবে। দ্বীপে হামলা বা দখল ইরানকে তার প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে লাভ করার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে, যদি ইরানি তেল বিশ্ববাজার থেকে বন্ধ হয় বা ইরান আরও ক্ষতিকর প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়, তাহলে ট্রাম্প উচ্চতর জ্বালানি মূল্যের ঝুঁকি নিচ্ছেন, যা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যাও সৃষ্টি করতে পারে। ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর (সিএসআইএস) একজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ক্লেটন সিগল বলেন, ইরান সবচেয়ে বড় তেল ও গ্যাস লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা এড়িয়ে গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক হতো। ফলে ইরানকে প্রতিহত করার বিকল্পবালান
হরমুজ প্রণালী থেকে দূরত্ব
খার্গ দ্বীপ হরমুজ প্রণালী থেকে প্রায় ৪০০ মাইল দূরে। তাই দ্বীপের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকলেও, এটি ইরানের মূল প্রভাবকে কমাতে খুব বেশি সাহায্য করবে না। যা হলো পারস্য উপসাগর থেকে জ্বালানি শিপিং নিয়ন্ত্রণ করা। সিগল বলেন, ইরান ইতিমধ্যেই সারা বিশ্বের জ্বালানি বাজারে প্রভাবশালী। আজ যদি আমরা খার্গ দ্বীপ দখল করি, তাহলে কীভাবে ইরান জাহাজে হামলা করা বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ক্ষতি করার ক্ষমতা হারাবে?
ট্রাম্পের হুমকি
ট্রাম্প শুক্রবার সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় দ্বীপের সামরিক লক্ষ্য সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। তিনি বলেন, যদি ইরান হরমুজ প্রণালীর ফ্রি অ্যান্ড সেফ প্যাসেজ বাধাগ্রস্ত করে, যুক্তরাষ্ট্র খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামোও ধ্বংস করতে পারে। সোমবার তিনি পুনরায় সতর্কবার্তা দেন, যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ মিনিটের নোটিশে সেখানে থাকা শক্তি সুবিধাগুলো ধ্বংস করতে পারবে। একই সময়ে প্রায় ২৫০০ জাপানভিত্তিক মেরিনসকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনের বিষয়টি নতুন জল্পনা তৈরি করেছে যে, ট্রাম্প হয়তো দ্বীপটি সম্পূর্ণ দখলের প্রলোভনে আছেন। তার প্রেস সেক্রেটারি কারোলিন লেভিট সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ট্রাম্প তার পুরো জীবন জুড়ে ইরান নিয়ে অত্যন্ত ধারাবাহিক অবস্থার মধ্যে আছেন। পুরোনো উক্তিটি পোস্ট করেছেন যেখানে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী আক্রান্ত হলে খার্গ দ্বীপ দখল করবে।
ঝুঁকির বিষয়
ওয়াশিংটনের ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসিস-এর সিনিয়র উপদেষ্টা রিচার্ড গোল্ডবার্গ বলেন, দ্বীপ দখল করা কঠিন ঝুঁকি বহন করে। তিনি বলেন, এমন একটি অভিযান কেবল তখনই যৌক্তিক হবে, যদি দ্বীপের ওপর ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর হুমকি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র খার্গ দ্বীপে পাঠানো তেলের ওপর কিছু নিয়ন্ত্রণ রাখে। অন্যথায়, গোল্ডবার্গ বলেন, দ্বীপের তেল অবকাঠামোতে হামলা অথবা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো সুবিধার ওপর- ইরানি শাসনব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করার একটি উপায় হতে পারে এবং সম্ভাব্য জন আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানোর সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। তিনি যুক্তি দেখান, ইরান হয়তো উপসাগরের মার্কিন মিত্র দেশের তেল সম্পদে বড় ধরনের প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা রাখে না।
সামরিক পরিপ্রেক্ষিত
মেরিনদের মধ্যপ্রাচ্যে প্রেরিত মিশনের নির্দিষ্ট দায়িত্ব এখনো প্রকাশ করা হয়নি। হয়তো তারা খার্গ দ্বীপ দখলের বদলে অন্য বিপজ্জনক মিশনে অংশ নেবে- যেমন, হরমুজ প্রণালীকে নিরাপদ রাখা, যা দিয়ে তাদের জাহাজকে দ্বীপে পৌঁছানোর আগে যেতে হবে। ভিলানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামরিক ভূগোল বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সিস গালগানো বলেন, খার্গ দ্বীপ দখল অভিযান সম্ভবত হরমুজ প্রণালীর উপকূলে বেশি সম্ভাব্য। দ্বীপ দখল করলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর চরম চাপের সুযোগ পাবে। তিনি বলেন, যেকোনো স্থল বাহিনী এক্ষেত্রে যুক্ত করলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক হিসাবকে পাল্টে দেয়। এটি একটি বড় পদক্ষেপ হবে।
ইতিহাস এবং বাজার প্রভাব
ইরানের ভূখণ্ড দখল করে শিপিং রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ব্যবহার নতুন নয়। গালগানো জানান, ১৯৮৬ সালে তিনি ২৬ বছর বয়সে সেনাবাহিনীর ট্যাংক ক্যাপ্টেন হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্বে ছিলেন। তখন ইরান পারস্য উপসাগরে ট্যাঙ্কারগুলোতে হামলা করছিল। তিনি তখন বন্দর আব্বাসে ল্যান্ডিং ও হরমুজ প্রণালি দখলের পরিকল্পনা নিয়ে ওয়ার-গেমিং করেন। ইরানকে খার্গ দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি বন্ধ করতে বাধ্য করলে বিশ্ববাজার থেকে বিশাল পরিমাণ তেল বাদ পড়বে। সম্ভবত সেটা হবে দীর্ঘ সময়ের জন্য। তেলের দাম ইতিমধ্যেই ১০০ ডলার ব্যারেল ছাড়িয়েছে। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগে তা ছিল ৭৩ ডলারের নিচে। তখন ইরানের প্রায় ৯০ ভাগ কাঁচা তেল খার্গ দ্বীপের মাধ্যমে রপ্তানি হতো।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান কয়েকটি ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালি দিয়ে পাঠাচ্ছে। ফলে কিছু পরিমাণ তেল এখনও বিশ্ববাজারে পৌঁছাচ্ছে। ১ মার্চ থেকে কমপক্ষে ১৪টি জাহাজ তেল বা অন্যান্য জ্বালানি পণ্য নিয়ে ইরান থেকে প্রণালি অতিক্রম করেছে, লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স এ তথ্য দিয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্র দেখাচ্ছে, আগের সপ্তাহের বিমান হামলার পরেও খার্গ দ্বীপ তেল রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। মঙ্গলবার তেলের লোডিং বার্থে তিনটি ট্যাঙ্কার দেখা গেছে। বিশ্লেষকরা বলেন, ইরানের প্রণালি বন্ধ করা, খার্গ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেশকে বিশ্ববাজারে মূল্য নির্ধারণে প্রভাব রাখতে সক্ষম করে। প্রণালী সাধারণত বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন করে এবং উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাস বহন করে। এটি এত সংকীর্ণ যে, ইরান ছোট নৌকা পাঠিয়ে বা উপকূল থেকে অস্ত্র চালিয়ে জাহাজে হুমকি দিতে পারে।
কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর পারমাণবিক নীতি প্রোগ্রামের কো-ডিরেক্টর জেমস এম. অ্যাকটন বলেন, প্রণালি নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য এত শক্তিশালী বিষয় যে, ট্রাম্পের খার্গ দ্বীপের তেল টার্মিনাল ধ্বংসের হুমকির মুখেও তারা সহজে সরে যাবে না। তিনি বলেন, প্রণালি বন্ধ রাখাই তাদের কাছে খার্গ দ্বীপের তেল সুবিধার চেয়ে বেশি মূল্যবান।
খার্গ দ্বীপে আরও হামলার সম্ভাবনা
ট্রাম্প সোমবার বলেন, এখনও নিশ্চিত নয় যে ইরান শুধু জাহাজে হামলা করেছে নাকি প্রণালির পানিতে মাইন বসাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, ইরান প্রণালিতে মাইন বসানো শুরু করেছে। ট্রাম্প বলেন, আমরা জানি না, কোনো মাইনও ফেলা হয়েছে কি না। যদি করে, এটি আত্মহত্যার মতো হবে। তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রণালীতে মাইন বসালে ইরান তার নিজস্ব তেল রপ্তানির ক্ষমতা সীমিত করবে। যদি তারা তেল জাহাজে লোড করতে না পারে, তেলের কিছুটা প্রবাহ রাখার জন্যও তাদের কম প্রেরণা থাকবে। ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির প্রফেসর ক্যাটলিন টালম্যাজ বলেন, ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল কেন্দ্র দখল করলে, তারা প্রণালিতে কোনো জাহাজ চলাচল দেয়ার অর্থনৈতিক প্রণোদনা পুরোপুরি হারাবে। তাই এটা বিপরীত প্রতিক্রিয়া দিতে পারে।


