অন্যান্য

প্রবাসীদের পাসপোর্ট ইস্যু নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মুখোমুখি | দৈনিক পূর্বাচল

দৈনিক পূর্বাচল ডেস্ক:

বিদেশে প্রবাসীদের পাসপোর্ট ইস্যু ও কনস্যুলার সেবার একক এখতিয়ার নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আইনি টানাপোড়েন। বিস্তারিত জানুন দৈনিক পূর্বাচলে।

বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের পাসপোর্ট ইস্যু ও কনস্যুলার সেবা প্রদান সংক্রান্ত একক কর্তৃত্ব ও এখতিয়ার নিয়ে একরকম মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় (১৯৭৩ সাল) ধরে এই দায়িত্ব পালন করে আসা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে গিয়ে ‘ভিয়েনা কনভেনশন’ ও ‘রুলস অব বিজনেস’-এর দোহাই দিয়ে পুরো কার্যক্রম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই টানাপোড়েন নিরসনে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকও কোনো ফল দিতে পারেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে শেষ পর্যন্ত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ চাওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

দ্বন্দের সূত্রপাত যেভাবে

সরকারের নীতিনির্ধারণী সূত্র জানায়, গত ২৮ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এক চিঠি পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। চিঠিতে জানানো হয়, সৌদি আরব, ওমান ও কাতারে অবস্থানরত প্রায় ৪০ লাখ প্রবাসীকে দ্রুততম সময়ে পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবা দিতে কোনো আর্থিক সংশ্লেষ ছাড়াই বেসরকারি আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেয়েছে। চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, Diplomatic Relations সংক্রান্ত VCDR (১৯৬১) ও VCCR (১৯৬৩) কনভেনশন এবং ‘Rules of Business-1996’ অনুযায়ী বিদেশে অবস্থিত দূতাবাস ও মিশনগুলোর মাধ্যমে পাসপোর্ট প্রদানসহ সামগ্রিক কনস্যুলার কার্যক্রম তাদের আওতাভুক্ত। ফলে পাসপোর্ট ও ভিসা উইংগুলোর একক দায়িত্ব তাদের হাতে থাকা উচিত।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাল্টা আইনি যুক্তি

পররাষ্ট্রের এই দাবির পরপরই কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত ১৩ অক্টোবর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরের সভাপতিত্বে আয়োজিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি আইনি পর্যালোচনা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, পররাষ্ট্রের দাবি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৫(৬), রাষ্ট্রপতির জারি করা ‘Rules of Business-1996 (সংশোধিত ২০২৫)’ এবং ‘সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪’-এর সরাসরি পরিপন্থী।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়:

  • দ্বৈতবাদী রাষ্ট্র (Dualist State): সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক) অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি দ্বৈতবাদী রাষ্ট্র। ফলে যেকোনো আন্তর্জাতিক কনভেনশন বা চুক্তি দেশের অভ্যন্তরীণ আইন বা প্রজ্ঞাপনকে ডিঙিয়ে প্রয়োগ করা যায় না।

  • ভিয়েনা কনভেনশনের সীমাবদ্ধতা: ভিয়েনা কনভেনশন কেবল স্বাগতিক রাষ্ট্র (Host State)-এর জমিতে প্রেরক রাষ্ট্রের কূটনৈতিক অধিকার নির্ধারণ করে। প্রেরক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কোন মন্ত্রণালয় কোন কাজ করবে, তা আন্তর্জাতিক আইন দিয়ে নির্ধারিত হয় না।

  • সংবিধিবদ্ধ এখতিয়ার: বিদেশে অবস্থিত পাসপোর্ট ও ভিসা উইংয়ের প্রশাসন, বায়োমেট্রিক ডেটা নিরাপত্তা, আউটসোর্সিং চুক্তি ও জনবল নিয়োগের সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব কেবল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের।

অনড় দুই পক্ষ, চোখ পরবর্তী বৈঠকে

বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও কোনো পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে নড়েনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, সচিবালয় নির্দেশমালা ও রুলস অব বিজনেস লঙ্ঘনের বিষয়টি তারা প্রয়োজনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে অবহিত করবে।

কর্মকর্তারা জানান, মূলত প্রবাসীদের পাসপোর্ট সেবা সহজ করতে আউটসোর্সিং এজেন্ট নিয়োগের প্রশাসনিক অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ নিয়েই এই জটিলতার সৃষ্টি। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে পুনরায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment