নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক পূর্বাচল
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল নির্মাতা এহতেশামের জীবন, কর্ম, ‘চাঁদনী’ সিনেমার পেছনের ইতিহাস এবং নতুন মুখ তৈরির গল্প নিয়ে দৈনিক পূর্বাচলের বিশেষ প্রতিবেদন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এহতেশাম এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী নাম। নতুন মুখ আবিষ্কার, দর্শকের নাড়ির স্পন্দন বুঝে গল্প নির্বাচন এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে তাঁর মুন্সিয়ানা তাকে ইন্ডাস্ট্রিতে এক আলাদা উচ্চতায় আসীন করেছে। কিংবদন্তি অভিনেত্রী শবনম, শাবানা, শাবনাজ ও শাবনূরের মতো তারকাদের চলচ্চিত্রজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এহতেশামের নাম। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘চাঁদনী’ চলচ্চিত্রটি বাংলা চলচ্চিত্রে তারুণ্যনির্ভর প্রেমের গল্প এবং নতুন জুটির জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
জন্ম ও বর্ণাঢ্য প্রারম্ভিক জীবন আবু নূর মোহাম্মদ এহতেশামুর রহমান (যিনি এহতেশাম নামেই সমধিক পরিচিত) ১৯২৫ সালের ১২ অক্টোবর ঢাকার বংশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ছোট ভাই চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক মুস্তাফিজ এবং মামা ছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক ই আর খান।
পড়াশোনার হাতেখড়ি সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে, পরবর্তীতে আরমানিটোলা স্কুলে লেখাপড়া করেন। এরপর ভারতে সিনিয়র ক্যামব্রিজ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কর্মজীবনের শুরুতে জিআইপি রেলওয়েতে ট্রাফিক কন্ট্রোলার হিসেবে যোগ দেন তিনি। বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে জানা যায়, পরবর্তীতে কিংস কমিশনের মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন পদেও যোগ দিয়েছিলেন এহতেশাম।
চলচ্চিত্র দুনিয়ায় প্রবেশ পাকিস্তানের করাচিতে অবস্থানকালে আশিক মল্লিকের ‘বাঘী’ চলচ্চিত্রের শুটিং দেখতে গিয়ে সিনেমা নির্মাণের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন তিনি। একপর্যায়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। লালমনিরহাট রেলওয়ে ইনস্টিটিউটের হল ইজারা নিয়ে সিনেমা প্রদর্শনের ব্যবসা শুরু করার পর নাটোর ও সান্তাহারে প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করেন। ১৯৫৬-৫৭ সালের দিকে গড়ে তোলেন চলচ্চিত্র পরিবেশনা সংস্থা ‘লিও ফিল্মস’। পরবর্তীতে পরিচালক, প্রযোজক ও পরিবেশক হিসেবে সফলভাবে কাজ করার পাশাপাশি কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপও লিখেছেন তিনি।
চলচ্চিত্র নির্মাণে অবিস্মরণীয় যাত্রা ১৯৫৯ সালে এহতেশাম পরিচালনা করেন তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘এ দেশ তোমার আমার’। ছবিটিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন জহির রায়হান ও কামাল আহমেদ। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্রাঙ্গনে ছবিটি অভাবনীয় সাড়া ফেলে। পরের বছর মুক্তি পায় ‘রাজধানীর বুকে’। এই দুটি চলচ্চিত্রের ব্যবসায়িক ও শৈল্পিক সাফল্য তাঁকে ঢালিউডের অন্যতম শীর্ষ পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
এরপর একে একে তিনি উপহার দেন— ‘হারানো দিন’ (১৯৬১), ‘চান্দা’ (১৯৬২), ‘নতুন সুর’ (১৯৬২), ‘তালাশ’ (১৯৬৩), ‘সাগর’ (৬৫), ‘চকোরি’ (১৯৬৭), ‘পীচঢালা পথ’ (১৯৬৮), ‘চাঁদ আর চাঁদনী’ (১৯৬৮), ‘পায়েল’ (১৯৬৮), ‘আনাড়ি’ (১৯৬৯) ও ‘দাগ’ (১৯৬৯)-এর মতো কালজয়ী সব চলচ্চিত্র।
‘চান্দা’ চলচ্চিত্রটিকে বাংলাদেশের প্রথম উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে ‘সাগর’ ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নির্মিত প্রথম দিককার রঙিন চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম। ভাষা, নির্মাণশৈলী ও বিষয়বৈচিত্র্যে তাঁর এই বহুমুখী কাজগুলো দর্শককে মুগ্ধ করেছিল।
দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৮৩ সালে মুক্তি পায় তাঁর পরিচালিত বহুল আলোচিত ছবি ‘দূরদেশ’। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন শশী কাপুর, নাদিম বেগ, শর্মিলা ঠাকুর, ববিতা ও রাজ বব্বর। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৪ সালে মুক্তি পায় ‘শক্তি’।
‘চাঁদনী’ ও নতুন যুগের সূচনা এহতেশামের দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনের অন্যতম আলোচিত ও মাইলফলক সৃষ্টি হলো ‘চাঁদনী’। ১৯৯১ সালের ৪ অক্টোবর মুক্তি পাওয়া ছবিটির পরিচালনার সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৬৬ বছর। ছবিটির পরিকল্পনা ও শুটিং শুরু হয়েছিল ১৯৯০ সালের দিকে।
এই ছবিতে নবাগত শাবনাজ ও নাঈম জুটিকে রূপালী পর্দায় অভিষিক্ত করেন তিনি। নতুন দুই মুখ নিয়ে দর্শকের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে—তা নিয়ে সংশয় থাকলেও মুক্তির পর ছবিটি দেশজুড়ে সাড়া ফেলে। অজন্তা কথাচিত্র নিবেদিত এই চলচ্চিত্রটি নব্বইয়ের দশকের তরুণ-তরুণীদের প্রেমের গল্পনির্ভর সিনেমার জোয়ার তৈরিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
‘চাঁদনী’র অসামান্য সাফল্যের পর শাবনাজ ও নাঈম ঢালিউডের অন্যতম জনপ্রিয় জুটিতে পরিণত হন। তাঁদের নিয়ে নির্মিত হয় একের পর এক ব্যবসাসফল ছবি। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে সিনেমা নির্মাণের পথ উন্মুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে মৌসুমী, সালমান শাহ ও শাবনূরের মতো সুপারস্টারদের উত্থানের নেপথ্যেও নব্বইয়ের দশকের এই পরিবর্তনশীল চলচ্চিত্রের ধারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কী ছিল ‘এহতেশাম ম্যাজিক’? এহতেশামের চলচ্চিত্রের নিরন্তর জনপ্রিয়তার মূলে রয়েছে তাঁর কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য। প্রথমত, প্রচলিত তারকাদের ওপর নির্ভর না করে নতুন মুখ আবিষ্কার ও তাঁদের দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। শবনম, শাবানা, শাবনাজ ও শাবনূর—এই চার জনপ্রিয় নায়িকার নামের প্রথম অক্ষর দিয়েই তাদের নামকরণ ও পরিচয়ের নেপথ্যে বিশেষ ভূমিকা ছিল এহতেশামের।
চলচ্চিত্র সমালোচকদের মতে, এহতেশামের আরেকটি বড় গুণ ছিল সমকালীন দর্শকের চাহিদা ও মনস্তত্ত্ব নিখুঁতভাবে অনুধাবন করা। ‘চাঁদনী’র ক্ষেত্রে তিনি তারুণ্যনির্ভর প্রেমের গল্পের সঙ্গে নতুন মুখ যুক্ত করে দারুণ এক বাজি জিতেছিলেন। এছাড়া আকর্ষণীয় চিত্রনাট্য, হৃদয়ছোঁয়া গান, সাবলীল অভিনয় এবং আবেগঘন গল্পের সুষম সমন্বয়ে তিনি সিনেমাগুলোকে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে দিতেন।
ষাট দশকের ক্লাসিক ধারা থেকে আশির দশকের যৌথ প্রযোজনা এবং নব্বইয়ের দশকের তারুণ্যনির্ভর রোমান্টিক ঘরানা—সময়ের সঙ্গে নিজেকে সফলভাবে মানিয়ে নিয়েছিলেন এই দূরদর্শী নির্মাতা। নতুন সম্ভাবনা চেনার অদম্য সাহস এবং তাকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলার দক্ষতাই ছিল মূলত ‘এহতেশাম ম্যাজিক’। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নতুন জুটি ও তারুণ্যের রোমান্টিকতার জয়গান গাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
-
:


