অন্যান্য

চরম সংকটে কমিউনিটি ক্লিনিক, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও ওষুধ ঘাটতি | দৈনিক পূর্বাচল

বিশেষ প্রতিবেদক:দৈনিক পূর্বাচল

দেশের ১৪,৪৭৫টি কমিউনিটি ক্লিনিকের ৩৫ শতাংশ ভবনই জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। জনবল সংকট, সময়সূচিতে অনিয়ম ও বিনামূল্যের ওষুধ ঘাটতিতে ভোগান্তিতে প্রান্তিক মানুষ। বিস্তারিত প্রতিবেদন।

দেশের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছিল ‘কমিউনিটি ক্লিনিক’। বৈশ্বিক দরবারে প্রশংসিত ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রশংসনীয় এই উদ্যোগটি এখন নানান সংকটে জর্জরিত। জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, চরম জনবল সংকট, সময়সূচিতে শিথিলতা এবং চাহিদামতো বিনামূল্যে ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগে আজ মুখথুবে পড়ার উপক্রম তৈরি হয়েছে। ফলে গ্রামবাংলায় প্রান্তিক মানুষের ভরসার এই স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’ হওয়ার পথে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

৩৫ শতাংশ ভবন জরাজীর্ণ, পরিত্যক্ত প্রাঙ্গণ

সারা দেশে বর্তমানে মোট ১৪ হাজার ৪৭৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। সরকারি হিসাবে এসব কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ চিকিৎসা ও পরামর্শ নেন। তবে বিশাল এই অবকাঠামোর প্রায় ৩৫ শতাংশ ভবনই এখন সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের মুখে দাঁড়িয়ে।

প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে রড বেরিয়ে গেছে, ইট-বালু ঝরে পড়ছে, ভাঙা জানালা দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকছে। অনেক ভবনে ফ্যান নষ্ট এবং দেওয়ালে রয়েছে বড় বড় ফাটল।

বাস্তবতার চিত্র ফুটে ওঠে খুলনার কয়রা সদর ইউনিয়নের উত্তর মদিনাবাদ কমিউনিটি ক্লিনিকে। সেখানে ছাদ ও দেওয়ালে ফাটল ধরে আবর্জনার স্তূপ জমায় ভবনটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে সিএইচসিপি প্রকৃতি গাইন পাশের একটি বাড়ির বারান্দায় বসে রোগী দেখছেন। সেখানে বিপি মেশিন নষ্ট থাকায় রোগীদের রক্তচাপ পর্যন্ত মাপা সম্ভব হচ্ছে না।

নির্মাণমান নিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন

১৯৯৮ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে নির্মিত ভবনগুলোর বয়স মাত্র ২৪ থেকে ২৮ বছর। যেখানে ভবন নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী এগুলো অন্তত ৫০ বছর ব্যবহারযোগ্য থাকার কথা, সেখানে এত অল্প সময়ে জরাজীর্ণ হওয়ার পেছনে নির্মাণকালীন অনিয়ম ও তদারকির অভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী জানান, “ভবন নির্মাণের বিধিবিধান মেনে চললে এবং উপকরণের মান ঠিক থাকলে ভবন এত দ্রুত পরিত্যক্ত হতে পারে না। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও মানের ঘাটতির কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।”

তবে এ বিষয়ে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুজ্জোহার ভাষ্য, “আমরা জরাজীর্ণ ভবনগুলোর তালিকা তৈরি করেছি। প্রায় ৬ হাজার ভবন পুনর্নির্মাণ ও মেরামতের পরিকল্পনা রয়েছে। যেসব ভবনে একদমই কাজ চালানো সম্ভব নয়, সেখানে বিকল্প স্থানে অস্থায়ীভাবে সেবা দেওয়া হচ্ছে।”

জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে আলোচনা গড়িয়েছে। সংসদ সূত্রে জানা গেছে, সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় প্রয়োজনীয় জমি ও বাজেট বরাদ্দ সাপেক্ষে আরও ৫৪০টি নতুন কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

সময়সূচিতে অনিয়ম ও জনবল সংকট

কাগজে-কলমে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ক্লিনিক খোলা থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ জায়গায় তার প্রতিফলন নেই। কোনো কোনো ক্লিনিকে বেলা ১১টায় খুলে ১টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়, আবার কিছু ক্লিনিক সপ্তাহে দু-তিন দিনের বেশি খোলে না।

সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌর শহরের এক কমিউনিটি ক্লিনিকের পাশের বাসিন্দা বিলকিছ বেগম বলেন, “ডাক্তার নিয়মিত আসেন না। বেলা ১১টায় এসে ১টার আগেই চলে যান, ফলে সাধারণ মানুষ সেবা পান না।”

এ বিষয়ে প্রশাসন নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শন চালিয়ে বেতন কর্তন বা সাময়িক বরখাস্তের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করলেও মূল সংকট লোকবলে। ১৪,৪৭৫টি ক্লিনিকের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৩,৮৭৮ জন। ২০২৪ সালের পর ট্রাস্টের বৈঠক না হওয়ায় নতুন করে জনবল নিয়োগ স্থগিত রয়েছে।

‘ওষুধের সাপ্লাই নেই’: খালি হাতে ফিরছেন রোগীরা

কমিউনিটি ক্লিনিকে আসা ৮০ শতাংশ সেবাগ্রহীতাই নারী ও শিশু। এখানে বিনামূল্যে ২২ পদের ওষুধ দেওয়ার বিধান থাকলেও রোগীদের প্রধান অভিযোগ— দু-তিন পদের বেশি সাধারণ ওষুধ মেলেনা। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বাসিন্দা সানোয়ার খাঁ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ওষুধ নিতে এসে খালি হাতে ফিরছি। দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলছেন ওষুধ নেই।”

যদিও ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পণ্য ও বেতন সহায়তা বাবদ মোট ৬৬০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

ভবিষ্যৎ রূপরেখা: ‘কমিউনিটি হাব’ করার পরিকল্পনা

দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নত ও সুসংগঠিত করতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সরকারের নীতি-নির্ধারকরা।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, “গ্রামের প্রতিটি ইউনিয়নে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মূল ‘হেলথকেয়ার ইউনিট’ গঠন করা হবে। এই ইউনিটের অধীন তিনটি করে ‘কমিউনিটি হাব’ থাকবে। বর্তমানে চালু থাকা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে আধুনিকায়ন করে এসব ‘কমিউনিটি হাবে’ রূপান্তর করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষের আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা শতভাগ নিশ্চিত হয়।”

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment