রাজনীতি

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও চূড়ান্ত হয়নি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা | দৈনিক পূর্বাচল

নিজস্ব প্রতিবেদক: দৈনিক পূর্বাচল

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর আবারও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই ও নতুন তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ৬টি তালিকা সত্ত্বেও কেন চূড়ান্ত হচ্ছে না প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম? জানুন বিস্তারিত।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল ও চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এ পর্যন্ত সরকারিভাবে ছয়টি তালিকা প্রস্তুত করা হলেও রাজনৈতিক পালাবদল এবং সংজ্ঞার পরিবর্তনের কারণে প্রতিবারই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে তালিকা। সর্বশেষ গত ১ অক্টোবর বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গেজেটভুক্তির আবেদন গ্রহণসংক্রান্ত গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। সরকারের পক্ষ থেকে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের ঘোষণা দেওয়া হলেও এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মনে তীব্র আক্ষেপ ও হতাশা কাজ করছে।

সরকার বদলেই বদলায় তালিকা: মুক্তিযোদ্ধাদের আক্ষেপ

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পরিবর্তনের সংস্কৃতি যেন একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই নতুন তালিকা তৈরির ঘোষণা দেয়। এটিকে তারা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং নিজেদের দুর্ভাগ্য হিসেবে উল্লেখ করে এখন এটিকে ‘নিয়তি’ হিসেবে মেনে নিয়েছেন।

চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও তালিকা যাচাইয়ের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। বর্তমান সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আহমেদ আজম খান এবং প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২৮ সেপ্টেম্বর সংসদীয় কমিটির সুপারিশে নতুন করে তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। গত বুধবার (৭ অক্টোবর) ছিল এই প্রক্রিয়ায় আবেদন জমা দেওয়ার শেষ দিন। একই দিনে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষ আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রকৃত তালিকা প্রণয়নের কৌশল ও করণীয় নিয়ে আলোচনা হলেও এতে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের শীর্ষপর্যায়ের কোনো নেতাকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি।

যা বললেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী

মতবিনিময় সভা শেষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান বলেন, ‘মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা প্রকৃত যোদ্ধা ছিলেন, তাদের সঙ্গে হাজার হাজার অমুক্তিযোদ্ধা যুক্ত হয়েছেন—এমন অভিযোগ সংসদের ভেতরে ও বাইরে বারবার উঠে এসেছে। ১৯৭১ সালের শহীদদের তালিকা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সঠিকভাবে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রস্তুত করতে পারলে আমরা ইতিহাসের দায় থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারব। অমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তবে এটি শেষ হতে সুনির্দিষ্ট সময় বলা যাচ্ছে না।’

অতীতে যত তালিকা ও সংখ্যা

সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই মূলত মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ছয়টি তালিকা তৈরি হয়েছে। প্রতিটি তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ওঠানামা করেছে। বর্তমানে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১ লাখ ৯৭ হাজার ৮০০ জন, যার মধ্যে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫৪ জন মাসিক ২০ হাজার টাকা করে রাষ্ট্রীয় ভাতা পাচ্ছেন।

  • প্রথম তালিকা (ভারতীয় তালিকা): স্বাধীনতার পর সেক্টর কমান্ডারদের প্রকাশনা অনুযায়ী অনিয়মিত ও নিয়মিত বাহিনী মিলে মোট ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮০০ জন মুক্তিযোদ্ধার কথা বলা হলেও, পরবর্তীতে ইবিআরসি’র দلیলে ৭০ হাজার ৮৯৬ জনের নাম পাওয়া যায়, যা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে সংরক্ষিত আছে।

  • দ্বিতীয় ও তৃতীয় তালিকা: ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্দেশে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের তত্ত্বাবধানে তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। ১৯৮৬ সালে ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৮ জনের ‘জাতীয় তালিকা’ প্রকাশিত হলেও তা গেজেটভুক্ত হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে বিএনপি আমলেও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভোটার-সূচক তালিকায় ৮৬ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নাম আসে।

  • চতুর্থ তালিকা (মুক্তিবার্তা): আওয়ামী লীগের শাসনামলে (১৯৯৬-২০০১) প্রথমে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯০ জনের তালিকা (‘মুক্তিবার্তা সবুজ’) এবং পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই করে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৫২ জনের আরেকটি তালিকা (‘মুক্তিবার্তা লাল’) প্রকাশ করা হয়।

  • পঞ্চম তালিকা (বিশেষ গেজেট): ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করে। ২০০৩ ও ২০০৪ সালে সামরিক বাহিনীর ৩৯ হাজার এবং অন্যান্য ১ লাখ ৫৯ হাজার—সবমিলিয়ে ১ লাখ ৯৮ হাজার জনের দুটি গেজেট প্রকাশ করে।

  • ষষ্ঠ তালিকা ও বর্তমান পরিস্থিতি: ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ৭০ হাজারেরও বেশি অমুক্তিযোদ্ধা অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ তোলে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বিভিন্ন সময়ে সংখ্যা কম-বেশি হলেও ২০২১ সালের মার্চে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৩৭ জনের একটি অপূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ তালিকা আর আলোর মুখ দেখেনি।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার করে ৫৫ বছরে এসেও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রকৃত তালিকা না থাকা এক বড় জাতীয় আক্ষেপ। বর্তমান সরকারের এই নতুন উদ্যোগ কতটা সফল হয় এবং বিতর্কহীনভাবে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা জাতির সামনে তুলে ধরতে পারে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment