বিশেষ প্রতিনিধি | দৈনিক পূর্বাচল
আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত খুব দ্রুতই সমাপ্ত হবে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি তিনি। এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত ‘খুব শিগগিরই’ শেষ হয়ে যাবে বলে জোরালো দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এই সংঘাতের অবসান ঠিক কবে নাগাদ হতে পারে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা উল্লেখ করেননি তিনি। একই সঙ্গে তেহরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া হবে না বলে নিজের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন ট্রাম্প।
মার্কিন ভোটারদের প্রতি আইআরজিসির খোলা চিঠি
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটির জনগণের উদ্দেশে একটি দীর্ঘ খোলা চিঠি প্রকাশ করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ২৫ পৃষ্ঠার এই চিঠিতে মার্কিন ভোটারদের ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আইআরজিসির দাবি, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আসলে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা সম্ভব। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও চলমান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণকে বিভ্রান্ত করছে বলেও অভিযোগ তুলেছে আইআরজিসি। এছাড়া ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন একতরফা সমর্থন এবং বিদেশি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অযাচিত সম্পৃক্ততার বিরুদ্ধে ভোটারদের সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে ইরানের সামরিক বাহিনীর নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ।
হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহনের পুনরুদ্ধার
সামরিক সংঘাত ও হামলা অব্যাহত থাকার মধ্যেও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাণিজ্যিক ডেটা অ্যানালাইসিস প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে এই নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের গড়ের প্রায় ৭৭ শতাংশের সমান।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহপথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের এই ঘুরে দাঁড়ানো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাণিজ্যে নতুন গতি ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে তেল রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও এই কৌশলগত নৌপথের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। জাহাজ চলাচল ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এখনও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান এখনও পরস্পরবিরোধী। প্রণালিটি নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে এই নৌপথ সচল রাখতে নিয়মিত সামরিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই মূলত হরমুজ দিয়ে তেলবাহী জাহাজের চলাচল বাড়ছে।
মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা ও ট্রাম্পের অনড় অবস্থান
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের অবসান ঘটাতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীর কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। গত সোমবার উভয় দেশের কর্মকর্তারা আলাদাভাবে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং যুদ্ধ বন্ধের শর্তে তেহরানের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের যুদ্ধ দ্রুত সমাপ্তির আশাবাদ, আইআরজিসির রাজনৈতিক কৌশলগত বার্তা এবং হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহনের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা—সব মিলিয়ে ইরান সংঘাতের সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ নতুন মোড় নিয়েছে। যুদ্ধের অবসান নিয়ে আশার বাণী শোনানো হলেও বাস্তবে সংঘাতের একটি স্থায়ী ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।


