আন্তর্জাতিক

সৌদির বিকল্প জ্বালানি পথ রক্ষায় ফরাসি সেনা, তৎপর পাকিস্তান-তুরস্কের ‘মক্কা চুক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক |

 লোহিতসাগরের তীরে অবস্থিত সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর এখন শুধু তেল ট্যাংক ও পাইপলাইনের পাহারায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক বিকল্প জ্বালানি পথ রক্ষার নতুন স্নায়ুকেন্দ্রে। হরমুজ প্রণালীর অনিশ্চয়তা, বাব আল-মান্দেবে হুতির প্রভাব এবং সৌদি শহরগুলোর দিকে আসা লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এই বন্দরকে আঞ্চলিক যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় এবার সেনা ও রাডার পাঠাচ্ছে ফ্রান্স। একই সঙ্গে সুরক্ষায় সহায়তার হাত বাড়াচ্ছে পাকিস্তান ও তুরস্ক।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানিয়েছে, প্যারিস ইয়ানবুতে সেনা, রাডার এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করবে। ফরাসি প্রশাসনের ভাষ্যমতে, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য কোনো সংঘাতে জড়ানো নয়, বরং কৌশলগত জ্বালানি স্থাপনা রক্ষা করা। উল্লেখ্য, ইয়ানবুতে বিশাল তেল সংরক্ষণ ও পরিশোধন স্থাপনা রয়েছে। পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল তেল এই বন্দরের দিকে পরিবাহিত হয়।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও হুতির আক্রমণ

গত বৃহস্পতিবার ইয়ানবুতে সৌদির সবচেয়ে বড় তেলক্ষেত্র আরামকোর স্থাপনা এবং রিয়াদে একটি সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করে হুতিরা। সৌদি জোট জানায়, তায়েফ ও ইয়ানবুর দিকে ছোড়া অন্তত ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। হরমুজে চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় সৌদি আরব বর্তমানে ইয়ানবুমুখী রপ্তানি পথের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে সেখানে হামলা এখন কেবল সৌদি নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং বৈশ্বিক তেল সরবরাহের জন্য বড় উদ্বেগ।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। গত বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলার ছাড়িয়ে যায়। স্পার্টা কমোডিটিজের বিশ্লেষক জুন গোহ সতর্ক করে বলেছেন, স্পষ্ট কোনো সমাধান না থাকায় বিশ্বজুড়ে তেলের মজুদের ঘাটতি আরও তীব্র হচ্ছে।

মক্কা চুক্তি ও ত্রিদেশীয় প্রতিরক্ষা তৎপরতা

এই উত্তেজনার মধ্যেই নিউ ইয়র্কে বৈঠকে বসেছেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান, পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। আরব নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈঠকে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির সচিবালয় গঠন এবং সেনাপ্রধানদের জরুরি বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। তিন মন্ত্রী মক্কা এবং সৌদি আরবের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন এবং জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সৌদির আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। আগামী তিন বছর পাকিস্তানের একজন মহাসচিবের নেতৃত্বে সৌদি আরবে চুক্তিটির স্থায়ী সচিবালয় পরিচালিত হবে। যৌথ প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে সমষ্টিগত প্রতিরোধ জোরদার করাই এর মূল লক্ষ্য।

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই কাঠামো বিস্তৃত হয়ে বৃহত্তর মুসলিম নিরাপত্তা জোটে রূপ নিতে পারে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। এমনকি ভবিষ্যৎ কাঠামোতে ইরানকে যুক্ত করার সম্ভাবনাও কিছু বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো জানানো হয়নি।

ইয়েমেনের তীব্র লড়াই ও বাস্তুচ্যুতি

এদিকে ইয়েমেনের ভেতরেও লড়াই চরম আকার ধারণ করেছে। হুতিরা মখা বন্দর ও লোহিতসাগরের কৌশলগত এলাকায় অবস্থান আরও শক্ত করেছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইয়েমেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ আবদুল কাদের আল-আলিমি-বাওজের অভিযোগ, হুতিরা নৌচলাচলের নিরাপত্তাকে ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার বানিয়ে পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করেছে।

সব মিলিয়ে ইয়ানবুর আকাশ এখন কেবল সৌদি প্রতিরক্ষার পরীক্ষাকেন্দ্র নয়, এটি মিত্রতারও এক বড় পরীক্ষা। ফরাসি সেনা ও রাডার তাৎক্ষণিক ঢাল তৈরি করলেও, কাগজের লেখা মক্কা চুক্তি বাস্তব হামলার মুখে কতটা কার্যকর হয়—রিয়াদ থেকে শুরু করে লোহিত সাগরের নৌপথ এবং তেলের বাজারের ভবিষ্যৎ সমীকরণ এখন তারই অপেক্ষায়।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment