ঢাকা: দুপুর কিংবা বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির চিরচেনা আড্ডা, অ্যালুমিনিয়ামের কেটলির ধোঁয়া আর ‘মামা, টাকাটা পরে দিই’—এমন পরিচিত সংলাপ যে কোনো সাবেক শিক্ষার্থীরই নস্টালজিয়া জাগাবে। তবে সময়ের পরিবর্তনে শহরের পরিধি বাড়ছে, নতুন জনপদ গড়ে উঠছে। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটেও এক চায়ের দোকান ঘিরে তৈরি হওয়া আস্থার সম্পর্ক আর স্মৃতির দ্যোতনা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। চার দশকের বেশি সময় ধরে হাজারো তরুণের নির্ভরতার প্রতীক হয়ে থাকা এই চা বিক্রেতা শুধু একজন ব্যবসায়ী নন, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মের চেনা মুখ।
১৯৮৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বাসুদেব গ্রাম থেকে ঢাকায় পা রেখেছিলেন স্বপন মামা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ভগ্নিপতির হাত ধরে রাজধানীতে আসা। গ্রামের বেকার যুবকের উদ্দেশ্যে বলা সেই সাধারণ বাক্যটিই বদলে দিয়েছিল জীবন—‘ঢাকা ভার্সিটি আসো, কিছু একটা করে খাওয়া যাবে।’
টিএসসির একটি বাদামগাছের নিচে আলুর চপ, বেগুনি, পেঁয়াজু আর ছোলা বিক্রির মাধ্যমে শুরু হয়েছিল পথচলা। পরবর্তীতে চায়ের কাপ যুক্ত হওয়ার পর থেকেই দোকানটি রূপ নেয় অনানুষ্ঠানিক মিলনকেন্দ্রে। চা বানানোর ফাঁকে তিনি দেখেছেন নতুন প্রজন্মের আগমন, পুরোনোদের বিদায়, প্রেম-বিচ্ছেদ আর নানা আন্দোলনের উত্তাপ।
দোকানি হিসেবে স্বপন মামার সবচেয়ে বড় পুঁজি ছিল শিক্ষার্থীদের প্রতি অগাধ আস্থা। পকেটে টাকা না থাকা শিক্ষার্থীকে নির্দ্বিধায় চা বা নাস্তা দেওয়ার সংস্কৃতি তিনি কায়েম করেছিলেন। হিসাবের খাতাকে কখনোই মানবিক সম্পর্কের চেয়ে বড় হতে দেননি তিনি। তার সরল স্বীকারোক্তি ছিল, ‘আজ না পারলে কাল দেবে… দু-এক কাপ চায়ের হিসাব নিয়ে আন্তরিকতা নষ্ট করে লাভ কী?’
আজকের দিনে যখন নতুন শহর হিসেবে গড়ে উঠছে পূর্বাচল, আধুনিক ক্যাফে ও কফি শপের ভিড় বাড়ছে, তখনো স্বপন মামার মতো মানুষেরা মনে করিয়ে দেন যে—ব্যবসার চেয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসার মূল্য ঢের বেশি। চার দশকের এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি শুধু চা পরিবেশন করেননি, বরং অজস্র তরুণের ছাত্রজীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত আশ্রয়স্থল হয়ে থেকেছেন।


