রাজনীতি

পাচার হওয়া ৮০ হাজার কোটি টাকা গোয়েন্দা জালে, শনাক্ত ৪০০ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান | দৈনিক পূর্বাচল

সোহেল হাওলাদার, নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল

প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ঢাকা

  • বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ৮০ হাজার কোটি টাকা ফেরাতে বিএফআইইউ, সিআইডি ও দুদকের যৌথ অভিযান। শনাক্ত ৪০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সোহেল হাওলাদার। বিস্তারিত জানুন দৈনিক পূর্বাচলে।

দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে বিদেশে পাচার করা প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা এবার কঠোর গোয়েন্দা জালে আটকা পড়েছে। এ বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত অন্তত চারশ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। এই অর্থ পুনরুদ্ধারে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তাদের প্রাথমিক তদন্ত সফলভাবে শেষ করেছে। একই সঙ্গে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) সরকারের আরও সাতটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। বিএফআইইউর সর্বশেষ জুনভিত্তিক প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এর আগে প্রথম ধাপে দেশের ১০টি শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের পাচার করা প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা উদ্ধারে চূড়ান্ত তদন্ত সম্পন্ন করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এসব ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে। পাশাপাশি, আরও ৪২টি খেলাপি প্রতিষ্ঠানের পাচারকৃত প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা ফিরিয়ে আনতে প্রাথমিক তদন্ত শেষে অধিকতর নিবিড় তদন্ত শুরু হয়েছে।

যেসব দেশে পাচার হয়েছে সিংহভাগ অর্থ

সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পাচার হওয়া এই ৮০ হাজার কোটি টাকার সিংহভাগই বিভিন্ন চ্যানেলে চলে গেছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সান ফ্রান্সিসকো, পানামা এবং পাপুয়া নিউগিনির মতো দেশগুলোতে। আইনি প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই অর্থ ফিরিয়ে আনতে ইতিমধ্যে এসব দেশের সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে।

এদিকে পাচার হওয়া অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশেই বিভিন্ন উপায়ে রয়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে জড়িত ব্যক্তিদের সন্দেহজনক ব্যাংক হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে। যদিও এই অর্থ বিদেশে স্থানান্তরিত হয়নি, তবুও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের বিধান অনুযায়ী সন্দেহজনক লেনদেনের কারণে এগুলোকে পাচার হিসেবেই নিজেদের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বিএফআইইউ।

জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব

সমন্বিত যৌথ টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চিহ্নিত ৪০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাচার করা অর্থ উদ্ধারে মাঠপর্যায়ে পুরোদমে কাজ করছে বিভিন্ন তদন্ত এজেন্সি। তাদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত একশ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চলা তদন্ত এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মী, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, উপদেষ্টা, সাবেক উচ্চপদস্থ আমলা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন শীর্ষ ব্যবসায়ী রয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে আমির হোসেন আমু, দীপু মনি, আসাদুজ্জামান খান কামাল, নসরুল হামিদ বিপু, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, শামীম ওসমান, ছায়েদুর রহমান, লিয়াকত সিকদার, হাছান মাহমুদ, আসাদুজ্জামান নূর, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ, রুখমিলা জামান, এ এইচ এম মোস্তফা কামাল, টিপু মুনশি, জুনাইদ আহমেদ পলক, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, গাজী মোজাম্মেল হক, তাজুল ইসলাম, আ ফ ম রুহুল হক, মহীউদ্দীন খান আলমগীর, বাহাউদ্দিন বাহার, মমতাজ বেগম, বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, সাবেক বিএসইসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, ওবায়দুল্লাহ আল মাসুদ, চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, পারভেজ তমাল, মোহাম্মদ আদনান ইমাম ও নাফিসা কামালের নাম উঠে এসেছে।

অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকা: অনুসন্ধানে এশিয়াটিক টকিং পয়েন্ট কমিউনিকেশনস লিমিটেড, অপটিমাম সার্ভিস লিমিটেড, ইউনিভার্সাল ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনস, এশিয়াটিক টিএমএস, ব্ল্যাকবোর্ড স্ট্র্যাটেজিজ, কুকি জার, স্টেনসিল বাংলাদেশ, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস, ২৪ টিকিট, আকাশ নীল, ই-অরেঞ্জ, আলিশা মার্ট, আলিফ ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং লিমিটেড, দালাল প্লাস ডটকম, ধামাকা, আনন্দের বাজার, অ্যামাস বিডি, ওয়ালমার্ট, রিং আইডি বিডি লিমিটেড, থলে ডটকমসহ বিভিন্ন সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞদের মতামত

বিএফআইইউর প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন গণমাধ্যমকে জানান, ১০টি বড় গ্রুপ এবং হাসিনা পরিবারের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ ছাড়া ৪২টি গ্রুপের অর্থ ফিরিয়ে আনতে বিদেশে আন্তর্জাতিক আইন ফার্ম বা ল ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নির্ধারিত ছক অনুযায়ী বাকি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়নশীল দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের মাত্র ১ শতাংশ সাধারণত ফেরত আনা সম্ভব হয়। আর এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গড়ে সাত থেকে আট বছর বা তার বেশি সময় লাগে। বাংলাদেশ অতীতে কেবল একবার সিঙ্গাপুর থেকে অর্থ ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছিল, যাতে ঠিক সাত বছর সময় লেগেছিল। যেসব দেশ পাচারের অর্থ সুরক্ষা দেয়, তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক ও আইনি স্তরে জোরালো আলোচনা চালিয়ে তাদের বোঝানো প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।

অন্যদিকে, এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, অস্ট্রিয়া, ডমিনিকা, গ্রেনাডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, মাল্টা, সেন্ট লুসিয়া ও তুরস্কের মতো দেশের সাতটি শহরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার সমমানের অবৈধ সম্পদের খোঁজ মিলেছে। সরকারের পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশজুড়ে ছয় শতাধিক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান এবং ৯ হাজারের বেশি ব্যাংক হিসাব জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment