রাজনীতি

ডিসেম্বরে ফিরছেন না শেখ হাসিনা: আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতায় আটকে প্রত্যাবর্তনের পথ

সোহেল হাওলাদার, নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল

ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিলেও বাস্তব পরিস্থিতি, ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক সমীকরণ এবং আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ ও সাংগঠনিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলতি বছর দেশে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। তার দেশে ফেরার পথ মূলত আইনি, কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক—এই তিন দিক থেকেই অবরুদ্ধ।

ঢাকার শক্ত অবস্থান ও ভারতের ভূমিকা

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা এখন আর শুধু শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার প্রশ্নে আটকে নেই। সরকারের পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, ভারত মানবিক কারণে তাকে আশ্রয় দিতে পারে, কিন্তু সেটির সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া, রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান বা কোনো ধরনের সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ যেন তাকে দেওয়া না হয়। ঢাকার কড়া অবস্থান হলো, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করলেও তার সেই ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা স্থিতিশীলতা প্রভাবিত করার সুযোগ নেই। এই নিশ্চয়তা এখন দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগেও এই ‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে ঢাকা।

আইনি বাধা ও আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো আইনি জটিলতা। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ও সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডের রায়ও ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে দেশে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এখন পুরোপুরি দিল্লির আইনি ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব সংকট ও সাংগঠনিক দুর্বলতা

সাড়ে ১৫ বছরের একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ার পর আওয়ামী লীগ বর্তমানে চরম নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক সংকটে রয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় অংশ কারাগারে বা আত্মগোপনে থাকায় এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মী মামলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকায় শেখ হাসিনাকে বরণ করার মতো কার্যকর সাংগঠনিক শক্তি দলের নেই। তৃণমূলের হতাশা কাটাতে গত জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরার কথা বললেও, দলীয় নীতিনির্ধারকদের মতে ওই ঘোষণা এখন কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর পেছনে কোনো দৃশ্যমান বা বাস্তব প্রস্তুতি নেই।

বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, শেখ হাসিনার প্রবাসজীবন নিয়ে পরিবারের পূর্বের বক্তব্য এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ডিসেম্বরের ফেরা নিছক একটি কথার কথা মাত্র। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতায় স্বল্প সময়ের মধ্যে তার প্রত্যাবর্তনের কোনো লক্ষণ বা প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক আলামত দৃশ্যমান নয়।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment