বিশেষ প্রতিনিধি দৈনিক পূর্বাচল:
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলজুড়ে সংঘটিত ভয়াবহ গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও এনটিএমসি-এর তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে লোমহর্ষক সাক্ষ্য দিয়েছেন একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী পরিবার।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সূত্র এবং প্রসেকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) গোয়েন্দা শাখা ও শীর্ষ প্রশাসনিক পদে কর্মরত অবস্থায় জিয়াউল আহসানের সরাসরি নির্দেশ ও অংশগ্রহণে এক হাজারের বেশি মানুষকে গুম ও হত্যা করা হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ এনেছেন চিফ প্রসেকিটর।
নদীতে লাশ গুমের ভয়াবহ কৌশল ও সাক্ষীদের বিবরণ
ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের ১০ম সাক্ষী আব্বাস মল্লিকসহ একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও সশস্ত্র বাহিনীর তৎকালীন প্রত্যক্ষদর্শী কর্মকর্তারা জিয়াউল আহসানের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের বিবরণ তুলে ধরেন:
-
মাঝনদীতে নৃশংস হত্যাকাণ্ড: বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানী ও বলেশ্বর নদীসংলগ্ন এলাকায় রাতে মাইক্রোবাসে করে অপহৃতদের নিয়ে যাওয়া হতো। মাঝনদীতে ট্রলার বা নৌকায় করে নিয়ে গিয়ে জিয়াউল আহসান স্বয়ং অত্যন্ত কাছ থেকে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে তাদের মাথায় ও বুকে গুলি করতেন।
-
প্রমাণ লোপাটে পেট কাটা ও সিমেন্টের বস্তা বাঁধনা: গুলি করার পর মৃতদেহের পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলা হতো—যাতে গ্যাসে লাশ ভেসে না ওঠে। এরপর গলায় বা পায়ে ইটের বা সিমেন্টের বস্তা বেঁধে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে সাগরে ও মাঝনদীতে ফেলে দেওয়া হতো।
-
মগজ ছিটে আসা এড়াতে কুৎসিত পদ্ধতি: সাক্ষীদের ভাষ্যমতে, খুব কাছ থেকে গুলি করার সময় রক্ত ও মগজ ছিটকে আসা এড়াতে মাথায় বালিশ বা তোয়ালে ঠেকিয়ে শুট করা হতো এবং গুলি করার আগে মাথায় হেলমেট বা টুপি খুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল।
-
সিরিয়াল কিলিং ও ইনজেকশন প্রয়োগ: কিছু বন্দিকে ইনজেকশন পুশ করে এবং কাউকে কাউকে রেলে কাটা ফেলার মতো সাজানো ‘এনকাউন্টার’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হতো বলে আদালতকে জানান সাক্ষীরা।
পিলখানা ও সামরিক-বেসামরিক গুমের অভিযোগ
বিডিআর বিদ্রোহ এবং পরবর্তী তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তৎকালীন দায়িত্বশীলদের ভাষ্যমতে, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক সেনাকর্তা ও বিডিআর সদস্যকেও একইভাবে গুম ও হত্যা করে সুন্দরবন বা বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইকন তথ্যমতে, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিরোধীদের গুম করার পর তাদেরকে কোথায় রাখা হয়েছে জানতে চাইলে সে সময় জিয়াউল আহসান উপহাস করে লাশ গুম করার দিকে ইঙ্গিত করতেন, যা সরাসরি শীর্ষ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের আদেশে পরিচালিত হতো বলে তিনি বলতেন।
আদালতে ‘নো গিল্টি’ দাবি ও কাঠগড়ার দৃশ্য
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার সময় বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালে জিয়াউল আহসান তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে ‘নো গিল্টি’ (নির্দোষ) দাবি করেন। তবে তাকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে আনা হয়।
গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ট্রাইব্যুনাল জিয়াউল আহসানের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দাবি জানিয়েছেন, এসব নৃশংস হত্যাকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি যেন নিশ্চিত করা হয়।


