উচ্চশিক্ষার আড়ালে শতকোটি টাকার ফাঁদ: বিএসবি গ্লোবালের বাশারের ৩৩ কোটির সম্পদ ক্রোক, অনুসন্ধানে সিআইডি

সোহেল হাওলাদার, নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল

ঢাকা:

শিক্ষা আর সেবার মুখোশ পরে বছরের পর বছর ধরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে একটি চক্র। উন্নত দেশে উচ্চশিক্ষার রঙিন প্রলোভন দেখিয়ে শত শত শিক্ষার্থীর কাছ থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে ‘বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্ক’-এর বিরুদ্ধে। এই সংঘবদ্ধ প্রতারণার মূল হোতা ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও বিএসবির চেয়ারম্যান খায়রুল বাশার বাহার।

প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত বিপুল অর্থ পাচারের (মানিলন্ডারিং) অভিযোগে ইতিমধ্যে বাশারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আদালতের নির্দেশে সম্প্রতি তার প্রায় ৩৩ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার বাইরেও এই চক্রের নামে অন্তত ৬০০ কোটি টাকার গোপন সম্পদের পাহাড় রয়েছে।

যেভাবে পাতা হতো প্রতারণার ফাঁদ: লামিয়ার গল্প

ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী লামিয়ার (ছদ্মনাম) জীবনের গল্পটি এই চক্রের নির্মম শিকার হওয়ার একটি বাস্তব উদাহরণ। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে জানায় যে, সে আমেরিকায় স্কুলিং ভিসায় স্কলারশিপ পেয়েছে। এরপর তাকে পাঠানো হয় বাশারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বিএসবি গ্লোবালে। সেখানে একজন মার্কিন নাগরিকের উপস্থিতিতে জমকালো ‘শুভেচ্ছা অনুষ্ঠান’ করে লামিয়ার মনে বিশ্বাস স্থাপন করানো হয়।

ভিসা প্রসেসিং ও সেশন ফি বাবদ প্রথমে ৬০ হাজার ডলারের কথা বলা হলেও পরে ‘বিশেষ স্কলারশিপ’-এর কথা বলে ১৫ লাখ টাকায় রফা হয়। লামিয়া সরল বিশ্বাসে প্রথমে ৫ লাখ টাকা জমা দেয়। প্রথম দিকে তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হলেও, গত ঈদুল ফিতরের ঠিক দুদিন আগে বাকি ১০ লাখ টাকার জন্য চাপ দেওয়া হয়। অন্যথায় পুরো প্রক্রিয়া এক বছর পিছিয়ে যাবে বলে ভয় দেখানো হয়। বাধ্য হয়ে দুটি গরু বিক্রি এবং ধারদেনা করে ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করে লামিয়ার পরিবার। কিন্তু টাকা পাওয়ার পর থেকেই বিএসবির কর্মকর্তারা যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে লামিয়া জানতে পারে, তার মতোই শত শত শিক্ষার্থীকে এভাবে নিঃস্ব করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি।

দৃশ্যমান ৩৩ কোটি, আড়ালে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ

সিআইডির মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের মামলায় বাশারের যেসব সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে, তার বিবরণ দিতে গিয়ে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানান, বাশার তার প্রথম স্ত্রীর নামে ভাটারা এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং দ্বিতীয় স্ত্রী কানিজ ফাতেমা ডোনার নামে শেলটেক বীথিকা প্রকল্পে ফ্ল্যাট কিনেছেন। এছাড়া রাজাবাজারে দুটি ফ্ল্যাট, আজিজ সড়কে দুটি বহুতল ভবন এবং নিজের ও প্রতিষ্ঠানের নামে ৩ হাজার ৪৮২ শতাংশের বেশি জমি কিনেছেন। সরকারি দলিলে এসবের মূল্য ৩৩ কোটি টাকা দেখানো হলেও বাজারমূল্য অনেক বেশি।

সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঢাকার বাইরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুটি মৌজায় বিএসবির স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নামে ১ হাজার ১০৬ শতাংশ জমির সন্ধান পাওয়া গেছে, যার প্রকৃত বাজার মূল্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এছাড়াও গুলশান ও বারিধারার মতো অভিজাত এলাকায় তাদের বেনামী ফ্ল্যাট ও জমির সন্ধান মিলছে।

দেশজুড়ে মামলার স্তূপ, তবুও থামেনি চক্রটি

শিক্ষাবিদ ও সফল ব্যবসায়ীর আড়ালে মূলত একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র চালাতেন বাশার। এই অভিযোগে গত বছরের ৪ জুন গুলশান থানায় তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় বাশার ছাড়াও তার স্ত্রী খন্দকার সেলিমা রওশন ও ছেলে আরশ ইবনে বাশারকে আসামি করা হয়। গত বছরের ১৪ জুলাই ধানমন্ডি থেকে বাশারকে গ্রেপ্তারও করেছিল সিআইডি।

সিআইডির মামলা ছাড়াও এই চক্রের বিরুদ্ধে অসংখ্য ব্যক্তিগত মামলা দায়ের হয়েছে। ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আমির হোসেন, ৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে রিতা আক্তার এবং ১৬ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মুক্তা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এছাড়া মানব পাচার ট্রাইব্যুনালেও বাশারের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।

২০০৩ সালে বিদেশে উচ্চশিক্ষার কনসালট্যান্সি ফার্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করা বিএসবি’র বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত দেড় শতাধিক ভুক্তভোগী সিআইডির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে এবং এই চক্রের সাথে জড়িত অন্য অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 10   +   10   =