কক্সবাজারে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধস: ক্ষয়ক্ষতি ৮৯০ কোটি টাকা, প্রাণহানি ৩১

কক্সবাজার প্রতিনিধি | দৈনিক পূর্বাচল

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬

কক্সবাজার: চকরিয়ার কৃষক মো. গফুর নিজের ফসলি জমির দিকে তাকিয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে জমিতে বাতাসে দুলছিল সবুজ আউশ ধান, সেখানে এখন কেবলই কাদা আর পলির স্তূপ। অন্যদিকে, পাশের গ্রামের মৎস্যচাষি শাহাবুদ্দিন ভেঙে যাওয়া ঘেরের পাড়ে দাঁড়িয়ে বিমর্ষ মুখে হিসাব মেলাচ্ছেন—কয়েক ঘণ্টার পাহাড়ি ঢলে ভেসে গেছে তার ১০ লাখ টাকারও বেশি মূল্যের মাছ। আর উখিয়ার হলদিয়াপালংয়ের গৃহবধূ ইসমত আরা ভেঙে পড়া টিনের ঘরের পাশে দুই সন্তানকে নিয়ে বসে আছেন চরম অনিশ্চয়তায়। মাথার ওপর ছাদ নেই, ঘরে খাবার নেই, সামনে কী অপেক্ষা করছে—তাও অজানা।

এ তিনটি দৃশ্য আলাদা কোনো বিচ্ছিন্ন পরিবারের নয়; এটি সাম্প্রতিক টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বিধ্বস্ত পর্যটন জেলা কক্সবাজারের সার্বিক চিত্র। গত ৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা নয় দিনের অতি ভারী বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যায় জেলার জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

এক নজরে কক্সবাজার বন্যার ক্ষয়ক্ষতি

জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক সমন্বিত ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের দুর্যোগের ভয়াবহতা অতীতের অনেক রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। নিচে ক্ষয়ক্ষতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:

খাতের নাম ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ / সংখ্যা
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ১০টি উপজেলা (৭০টি ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভা)
ক্ষতিগ্রস্ত জনসংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি পরিবার (প্রায় ২৪ লাখ মানুষ)
মোট আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৮৯০ কোটি টাকা (প্রাথমিক হিসাব)
মোট প্রাণহানি ৩১ জন (যার মধ্যে ১৫ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী)
সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি ৬৬৮টি
আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ১৫ হাজার ৮৫০টি

মাঠপর্যায়ের চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই শেষে এই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা।

পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে ৩১ জনের মৃত্যু

প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে জেলায় মোট ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। মৃত্যুর কারণ ও অঞ্চল বিশ্লেষণে দেখা গেছে:

  • পাহাড়ধসে প্রাণহানি: সবচেয়ে বেশি ১৯ জন মারা গেছেন পাহাড়ধসের ঘটনায়।

  • পানিতে ডুবে মৃত্যু: পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন ৮ জন।

  • অন্যান্য কারণ: দেয়ালধস ও নৌকাডুবিতে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

  • রোহিঙ্গা শিবিরের ক্ষয়ক্ষতি: নিহতদের মধ্যে ১৫ জনই উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা। পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানের কারণে সেখানে প্রাণহানির হার বেশি ছিল।

ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ, বেড়িবাঁধ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা

টানা রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিতে মাতামুহুরী ও বাঁকখালীসহ জেলার প্রধান প্রধান নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে বিভিন্ন পয়েন্টে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ভেঙে গিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। গ্রামীণ সড়কগুলো তলিয়ে যাওয়ায় জেলা সদরের সাথে বহু জনপদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উখিয়া, চকরিয়া, মহেশখালী, টেকনাফ, কক্সবাজার সদর ও পেকুয়া উপজেলা। দুর্গত এলাকাগুলোতে টানা কয়েক দিন বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় জরুরি উদ্ধারকার্য ও ত্রাণ বিতরণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

ঘর হারিয়ে আশ্রয়হীন হাজারো পরিবার: মানবিক সংকটের আশঙ্কা

বন্যা ও পাহাড়ধসের সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই বসতভিটায়। সরকারি তথ্যমতে, ৬৬৮টি ঘর সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে এবং প্রায় ১৫ হাজার ৮৫০টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হলেও মানুষের ভোগান্তি কমেনি। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে নিজ ভিটায় ফিরে আসা পরিবারগুলো চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে গেলেও এখনো রয়ে গেছে হাঁটুসমান কাদা। নষ্ট হয়ে গেছে ঘরে থাকা খাদ্যশস্য, আসবাবপত্র, পরিধেয় বস্ত্র এবং শিশুদের শিক্ষাসামগ্রী। উপার্জনের পথ হারিয়ে এবং তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটছে হাজারো মানুষের। স্থানীয়রা এখন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বড় ধরনের ত্রাণ সহায়তার অপেক্ষা করছেন।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 1   +   6   =