লাইফস্টাইল ডেস্ক | দৈনিক পূর্বাচল
ন্যাশনাল জিওগ্রাফির গবেষণা ও গবেষক সোহেল হাওলাদারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাঁশের কচি অঙ্কুর রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে দারুণ কার্যকরী। জানুন এর পুষ্টিগুণ ও সঠিক রান্না পদ্ধতি।
ঢাকা: এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী রান্নায় বহুল ব্যবহৃত একটি উপাদান ‘বাঁশের কচি অঙ্কুর’ (ব্যাম্বু শুট)। পুষ্টিগুণ ও অনন্য স্বাস্থ্য উপকারিতার কারণে এটিকে বর্তমান সময়ের একটি ‘সুপারফুড’ হিসেবে বিবেচনা করছেন পুষ্টিবিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বাঁশের কচি অঙ্কুর খেলে রক্তে শর্করা বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, হজমশক্তি বৃদ্ধি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
সম্প্রতি বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ন্যাশনাল জিওগ্রাফি-তে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বাঁশের কচি অঙ্কুরের এসব নানাবিধ গুণাগুণ তুলে ধরা হয়েছে।
হৃদরোগ ও ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কার্যকর
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বাঁশের কচি অঙ্কুর খেলে তা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি এটি রক্তের চর্বির (লিপিড) মাত্রা ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করে এবং অন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত করে, যা সরাসরি হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
যুক্তরাজ্যের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ও এই গবেষণার সহলেখক লি স্মিথ জানান, বাঁশের কচি অঙ্কুরে থাকা উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহবিরোধী উপাদান শরীরের কোষের ক্ষতি রুখতে ভূমিকা রাখে।
বিশেষ করে আলু, রুটি বা অন্যান্য শর্করাযুক্ত খাবার উচ্চ তাপে রান্না করলে ‘অ্যাক্রিলামাইড’ ও ‘গ্লাইসিডামাইড’ নামের ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হয়। এসব যৌগ স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যা এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। বাঁশের কচি অঙ্কুরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এই ক্ষতিকর যৌগগুলোর প্রভাব কমাতে শরীরকে সুরক্ষা দেয়।
কম ক্যালরি, উচ্চ পুষ্টিগুণ
বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের ক্লিনিক্যাল অধ্যাপক জোয়ান সালজে ব্লেক বলেন, “এটি এমন একটি খাবার, যার পুষ্টিগুণ সম্পর্কে অনেকেই ভুলে গেছেন।”
এতে ক্যালরি ও চর্বি একেবারেই কম, কিন্তু পুষ্টি উপাদান প্রচুর। প্রতি এক কাপ বাঁশের কচি অঙ্কুরে প্রায় ৩ গ্রাম প্রোটিন থাকে। এ ছাড়া এতে রয়েছে পর্যাপ্ত খাদ্যআঁশ (ফাইবার), প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড, সেলেনিয়াম, পটাশিয়াম, কপার, ফসফরাস, আয়রন এবং ভিটামিন এ, বি-৬, ই, কে, থায়ামিন ও নিয়াসিন। এর উচ্চ খাদ্যআঁশ হজমে সহায়তা করে এবং অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখে।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট ও গবেষণা
বাংলাদেশের কৃষি-অর্থনীতি ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন গণমাধ্যম গবেষক ও ‘জেআইডিএস কনসালটেন্সি’ (JIDS Consultancy)-এর প্রধান নির্বাহী সোহেল হাওলাদার। আন্তর্জাতিক এই গবেষণার প্রেক্ষিতে তিনি জানান, “আমাদের পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাঁশের কচি অঙ্কুর বা ‘বাঁশ কোড়ল’ বেশ জনপ্রিয়। তবে সঠিক সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে সাধারণ মানুষের কাছে এর পুষ্টিগুণ পৌঁছাচ্ছে না। ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে এই দেশীয় সুপারফুডটি চমৎকার ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটি রান্নার ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের নির্দেশিত সঠিক তাপমাত্রা ও সেদ্ধ করার নিয়ম মেনে চলতে হবে, যাতে এর ভেতরে থাকা ক্ষতিকর উপাদান দূর হয়।”
সাবধানতা: কাঁচা খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বাঁশের কচি অঙ্কুর কখনোই কাঁচা খাওয়া উচিত নয়। অধ্যাপক লি স্মিথ জানান, কাঁচা বাঁশের কচি অঙ্কুরে ‘সায়ানোজেনিক গ্লাইকোসাইড’ নামক উপাদান থাকে, যা শরীরে প্রবেশ করে বিষাক্ত ‘হাইড্রোজেন সায়ানাইড’ তৈরি করতে পারে। এর ফলে তীব্র সায়ানাইড বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে।
তাছাড়া, দীর্ঘদিন ধরে অল্প মাত্রায় এই যৌগ শরীরে গেলে থাইরয়েড গ্রন্থি অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যেতে পারে (গয়টার রোগ), বিশেষ করে যাদের শরীরে আয়োডিনের ঘাটতি রয়েছে।
যেভাবে প্রস্তুত ও রান্না করবেন
তাজা বাঁশের কচি অঙ্কুর রান্নার আগে ভালোভাবে ধুয়ে বাইরের শক্ত ও আঁশযুক্ত অংশটি কেটে বাদ দিতে হবে। এরপর প্রয়োজনমতো টুকরো করে কেটে, ফুটন্ত পানিতে সামান্য লবণ দিয়ে অন্তত ৩০ মিনিট সেদ্ধ করতে হবে (অথবা নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না করতে হবে)। সেদ্ধ করার ফলে এর ভেতরের ক্ষতিকর উপাদানগুলো সম্পূর্ণ দূর হয়ে যায় এবং এটি খাওয়ার জন্য নিরাপদ হয়। এটি তরকারি, স্যুপ কিংবা ভাজিতে যুক্ত করলে খাবারের স্বাদ ও মচমচে ভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

