চলচ্চিত্রের ‘মাস্টার মেকার’ দিলীপ বিশ্বাসের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

বিনোদন প্রতিবেদক | 

ঢাকা: বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সোনালী যুগের অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় চিত্রনির্মাতা দিলীপ বিশ্বাসের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৬ সালের ১২ জুলাই ৬৪ বছর বয়সে বিনোদন জগতের এই কীর্তিমান পুরুষ শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গুণী এই পরিচালকের প্রয়াণ দিবসে দৈনিক পূর্বাঞ্চল পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

একের পর এক দর্শকনন্দিত ও বাণিজ্যসফল চলচ্চিত্র উপহার দিয়ে ঢালিউডে নিজেকে ‘সোশ্যাল সিনেমার মাস্টার মেকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন দিলীপ বিশ্বাস। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রে জমজমাট নাটকীয় কাহিনীর পাশাপাশি থাকতো সুস্থ বিনোদনের সব ধরণের রসদ। সামাজিক গল্পের বাণিজ্যিক নির্মাতা হিসেবে বাংলা চলচ্চিত্রে নিজস্ব এক স্বতন্ত্র ধারা প্রবর্তন করেছিলেন তিনি।

বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী দিলীপ বিশ্বাস

১৯৪২ সালের ৪ ডিসেম্বর পিরোজপুরের চাঁদকাঠি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন দিলীপ বিশ্বাস। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আকাশচুম্বী খ্যাতি পেলেও, শোবিজে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল একজন কণ্ঠশিল্পী ও অভিনেতা হিসেবে।

এক সময় প্যারোডি গানের গায়ক হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। এমনকি তাঁর প্যারোডি গানের লং প্লে ডিস্কও বের হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে জহির রায়হান পরিচালিত কালজয়ী ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর রুপালি পর্দায় আগমন ঘটে। এরপর একে একে ‘আনোয়ারা’, ‘মোমের আলো’, ‘দুই ভাই’, ‘আলোমতি’, ‘সন্তান’, ‘স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা’ ও ‘চেনা অচেনা’র মতো জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে অবদান রাখেন।

অভিনয় ও সহকারী পরিচালনা

শুরুর দিকে ‘হাবুর বিয়ে’ নামে একটি চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করলেও ছবিটি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়নি। তবে অভিনেতা হিসেবে ‘রংবাজ’, ‘দুই ভাই’, ‘আনোয়ারা’, ‘মোমের আলো’, ‘সমাধান’, ‘চাবুক’, ‘নয়নের আলো’ এবং ‘সুরুজ মিঞা’র মতো অসংখ্য কালজয়ী ছবিতে কাজ করে দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। পরবর্তীতে অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ শুরু করেন।

‘মাস্টার মেকার’ দিলীপ বিশ্বাস

১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সমাধি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন দিলীপ বিশ্বাস। প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে— বন্ধু, আসামী, অনুরোধ, দাবী, আনারকলি, জিঞ্জির, অংশীদার, অপমান, অস্বীকার, অপেক্ষা, অকৃতজ্ঞ, অজান্তে এবং মায়ের মর্যাদা।

এছাড়াও ভারতের কলকাতায় গিয়ে তিনি নির্মাণ করেন ‘আমার মা’, ‘আমাদের সংসার’ এবং ‘অকৃতজ্ঞ’ নামের তিনটি ব্যবসাফল চলচ্চিত্র। ‘দাবী’ চলচ্চিত্রের অংশীদার প্রযোজক হয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা ‘গীতি চিত্রকথা’। এই ব্যানার থেকে ‘দখল’, ‘সাতরাজার ধন’ এবং ব্লকবাস্টার হিট ‘শ্বশুরবাড়ী জিন্দাবাদ’ সহ বহু সিনেমা প্রযোজিত হয়।

জাতীয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা

চলচ্চিত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দিলীপ বিশ্বাস দুইবার মর্যাদাপূর্ণ ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’-এ ভূষিত হন। ‘অপেক্ষা’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার এবং ‘অজান্তে’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা হিসেবে তিনি এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা লাভ করেন।

চলচ্চিত্র অঙ্গনে অত্যন্ত বিনয়ী, ভদ্র ও সজ্জন মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন দিলীপ বিশ্বাস। তারকা তৈরিতে বিশেষ দক্ষতার কারণে অনেকেই তাঁকে ‘স্টার মেকার’ বলেও ডাকতেন। হিট-সুপারহিট ছবি নির্মাণের এই কীর্তিমান কারিগর চিরকাল সিনেমা দর্শকদের হৃদয়ে এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 7   +   10   =