অন্যান্য

শব্দদূষণ: এক অদৃশ্য ঘাতক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি

সোহেল হাওলাদার| দৈনিক পূর্বাচল

UNEP ও বিভিন্ন গবেষণার তথ্যসহ শব্দদূষণের ভয়াবহতা, স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর প্রভাব এবং প্রতিকার নিয়ে সোহেল হাওলাদারের বিশেষ অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন।

শব্দদূষণ বর্তমানে আমাদের পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত ও উচ্চমাত্রার শব্দ মানবদেহে ও মানসিক স্বাস্থ্যে নিত্যদিন ফেলছে ক্ষতিকর প্রভাব। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ গবেষণার ভয়াবহ তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন নগরীতে হাইড্রোলিক হর্ন, অপরিকল্পিত সাউন্ড সিস্টেম ও নির্মাণকাজের বিকট শব্দ এখন অদৃশ্য ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব রেকর্ড ও গবেষণার ভয়াবহ চিত্র

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (UNEP) বিশ্বব্যাপী প্রকাশিত ‘ফ্রন্টিয়ার্স’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শব্দদূষণের শহরের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে ঢাকা। এই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী:

  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর নির্ধারিত মাত্রা: স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য শব্দের সহনশীল মাত্রা সর্বোচ্চ ৫০-৫৫ ডেসিবল।

  • ঢাকায় শব্দের মাত্রা: গবেষণায় ঢাকার গড় শব্দঝুঁকি রেকর্ড করা হয়েছে ১১৯ ডেসিবল। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডের অর্ধেকেরও কম নিরাপদ সীমার বিপরীতে দ্বিগুণেরও বেশি, যা একপ্রকার ‘শব্দ বোমার’ শামিল।

  • ক্যাপস (CAPS)-এর গবেষণা: স্ট্যামফোর্ড বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (CAPS) এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর সহনশীল সীমার চেয়ে উচ্চমাত্রার শব্দ দূষণ আগে দিনে ১২ ঘণ্টা স্থায়ী হলেও তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে।

স্বাস্থ্যে ক্ষতিকর প্রভাব ও চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী শব্দদূষণের ফলে মানুষের শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের নাক-কান-গলা (ENT) বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মতানুসারে:

  • শ্রবণশক্তি হ্রাস: নগরে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশের একটি বড় অংশ ও নিয়মিত যাতায়াতকারী মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রবণ জটিলতায় ভুগছেন।

  • শারীরিক জটিলতা: অনবরত উচ্চ শব্দ মানুষের রক্তচাপ বৃদ্ধি করে, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় এবং তীব্র মাইগ্রেন তৈরি করে।

  • মানসিক ও মানসিক বিকাশ: শিশুদের ক্ষেত্রে মেধা ও পড়ার মনসংযোগ বিঘ্নিত হচ্ছে, পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে মেজাজ খিটখিটে হওয়া, অনিদ্রা ও মানসিক অস্থিরতা বহুগুণ বাড়াচ্ছে।

সমাধানের উপায় ও পরিবেশবিদদের পরামর্শ

পরিবেশবিদরা মনে করেন, শব্দদূষণ রোধে কেবল সচেতনতাই নয়, কঠোর আইন প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা’ সঠিকভাবে কার্যকর করা, যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা, হাসপাতালের মতো নীরব এলাকায় হর্ন দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা এবং উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা আবশ্যক।

বিজ্ঞানভিত্তিক এসব তথ্য প্রমাণ করছে যে, এখনই যথাযথ আইনগত ও সামাজিক পদক্ষেপ না নিলে এই নীরব মহামারী গোটা জাতির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বিপদের মুখে ফেলবে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment