দুই হত্যা মামলার আসামি হলেন ফেনীর এসপি

দুই হত্যা মামলার আসামি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানকে ফেনী জেলার নতুন পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৫ মে) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে এই আদেশ জারি করা হয়।

তবে যুবদল নেতাসহ দুটি হত্যা ও গুমের মামলার এই আসামিকে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের পর দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং তার পদায়ন বাতিল করে তাকে আইনের আওতায় আনার দাবিতে বুধবার (৬ মে) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি লিখিত আবেদন জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের এক সদস্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ আট বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন মাহবুব আলম খান। ওই সময়ে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলা, বাধা সৃষ্টি এবং নেতাকর্মীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের মূল কারিগর ছিলেন তিনি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার সেইসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের চিত্র প্রকাশ্যে আসে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালত ও থানায় তার বিরুদ্ধে দুটি পৃথক হত্যা মামলা দায়ের করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো জেলার শিবগঞ্জ থানার যুবদল কর্মী মিজানুর রহমান হত্যা ও তার ভাই ছাত্রদল নেতা রেজাউল করিম গুমের ঘটনা।

২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন শিবগঞ্জের যুবদল কর্মী মিজান। এই ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিহতের বাবা আইনাল হক শিবগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, যেখানে ১০ নম্বর আসামি করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব আলম খানকে। মামলার বিবরণী অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১৭ আগস্ট ছাত্রদল নেতা সেতাউর রহমানকে গ্রেপ্তারের জন্য তাদের বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। তাকে না পেয়ে তার ভাই মিজানকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরবর্তীতে মিজানের মুক্তির জন্য পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ২০ লাখ টাকা দাবি করলে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আর্থিক সহায়তায় পরিবারটি ৯ লাখ টাকা পরিশোধ করে। কিন্তু বাকি টাকার জন্য দরকষাকষি চলার মাঝেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও তাদের আরেক ভাই রেজাউল করিমকেও মেস থেকে তুলে নিয়ে যায় ডিবি পুলিশ। অনেক দিন নিখোঁজ রাখার পর ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে একটি কথিত ‘জঙ্গি আস্তানায় বোমা বিস্ফোরণ ও বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে মিজানকে হত্যা করা হয় এবং রেজাউলকে চিরতরে গুম করে ফেলা হয়, যার সন্ধান আজ ১০ বছরেও মেলেনি।

এই লোমহর্ষক ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবারটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও গুম কমিশনেও লিখিত অভিযোগ জমা দেয়, যার তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ফিরোজ আহমেদ নামে আরেক ব্যক্তি বাদী হয়ে শিবগঞ্জ থানায় দ্বিতীয় একটি হত্যা মামলা করেন, যেখানে মাহবুব আলম খানকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়। শিবগঞ্জ থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মতে, এসব মামলায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এমন গুরুতর ফৌজদারি মামলার আসামিকে ফেনীর এসপি হিসেবে পদায়ন করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের ভাই ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সেতাউর রহমান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আবেদন জমা দেওয়ার পর তিনি বলেন, ‘এই পুলিশ কর্মকর্তা চাঁপাইনবাবগঞ্জে থাকাকালীন আমাদের পুরো পরিবার ধ্বংস করে দিয়েছেন। কত মায়ের বুক খালি করেছেন তার হিসাব নেই। মামলা থাকার পরও তাকে কীভাবে এত বড় পুরস্কার দেওয়া হয়, আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’

এদিকে মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান জানান, ফৌজদারি মামলায় জামিন না নেওয়া ব্যক্তি আইনত পলাতক হিসেবে গণ্য হন। এমন গুরুতর অভিযুক্তকে বরখাস্ত না করে জেলার শীর্ষ কর্মকর্তা বানানো চব্বিশের গণবিপ্লবের চেতনার পরিপন্থী।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সিএমপির উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান দাবি করেন, দুটি মামলার মধ্যে একটি থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় মামলার ঘটনার সময় তিনি প্রশিক্ষণে ছিলেন। যথাযথ প্রমাণ জমা দিলে এই মামলা থেকেও তিনি রেহাই পাবেন বলে আশা করছেন।

তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গণমাধ্যম থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 5   +   1   =