দিনের শুরু ও শেষ: মানুষের মন ও শরীর বদলে দেয় সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের ‘গোল্ডেন আওয়ার

ফিচার ডেস্ক, : সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত যেন মানুষের জীবনের ‘বুকএন্ড’ বা বইয়ের দুই প্রান্তের দুটি স্ট্যান্ডের মতো, যা পুরো দিনটিকে একটি সুশৃঙ্খল ফ্রেমে বেঁধে রাখে। প্রকৃতির এই চমৎকার আলো-আঁধারির খেলা কেবল দেখার সৌন্দর্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বিজ্ঞান বলছে—ভোর বা সন্ধ্যার এই ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা সোনালী আলোর বিশেষ সময়টি মানুষের স্মৃতিশক্তি, ঘুম এবং মেজাজের ওপর এক অলৌকিক ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের কেপ কডের এক চমৎকার সূর্যাস্তের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে একজন লেখক জানান, তার বিয়ের আগের রাতে নানা মানসিক দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ এক নিমেষেই উধাও হয়ে গিয়েছিল কেবল দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া এক জাদুকরী সূর্যাস্ত দেখে। চারপাশ জলবেষ্টিত সেই উপদ্বীপে বাতাসের আর্দ্রতা যখন সূর্যের আলোকে বিচ্ছুরিত করে উজ্জ্বল কমলা, সোনালী আর গোলাপী রঙের এক মায়াবী আবহ তৈরি করেছিল, তখন মনের সব নেতিবাচক চিন্তা যেন সেই ডুবন্ত সূর্যের সাথেই অস্ত চলে গিয়েছিল।

নেতিবাচক চিন্তার চক্র ভাঙার প্রাকৃতিক ওষুধ

গবেষণায় দিন দিন এই প্রমাণ জোরালো হচ্ছে যে, সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত মানুষের মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি এবং গভীর প্রভাব ফেলে। এটি মানুষের তীব্র বিষণ্ণতা, মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমায়; পাশাপাশি স্মৃতিশক্তি, সৃজনশীলতা এবং ঘুমের মান বাড়াতে সাহায্য করে। এমনকি মানুষের মধ্যে পরোপকারী ও সহানুভূতিশীল মনোভাবও জাগ্রত করে এই আলো।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ যখন দীর্ঘক্ষণ কোনো নেতিবাচক চিন্তার আবর্তে আটকে থাকে, তখন সূর্যাস্তের মতো মনমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য মানুষের পুরো মনোযোগকে নিজের দিকে কেড়ে নেয়। ফলে চিন্তার সেই ক্ষতিকর নেতিবাচক চক্রটি মুহূর্তের মধ্যেই ভেঙে যায় এবং মানুষ বর্তমানকে উপভোগ করতে শুরু করে।

সূর্যাস্তের ‘আশ্চর্য’ প্রভাব

বিজ্ঞানীদের মতে, সূর্যাস্তের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক সুবিধাটি আসে এর থেকে তৈরি হওয়া ‘বিস্ময়’ বা ‘অপার ভালোলাগা’ (Awe) অনুভূতির মধ্য দিয়ে। যখন আমরা বিশাল এবং গভীর কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য বা অলৌকিক সুন্দরের মুখোমুখি হই, যা আমাদের স্বাভাবিক চিন্তার সীমানাকে ছাড়িয়ে যায়—তখনই মনের ভেতর এই অনুভূতির সৃষ্টি হয়। এটি মানুষের চারপাশের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির সামাজিক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং দীর্ঘদিনের গবেষক মিশেল শিওটা বলেন, “বিস্ময়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি মানুষের মনের ভেতর নিজের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি করায়। মানুষ তখন বুঝতে পারে যে মহাবিশ্বের এই বিশালতার তুলনায় তার ব্যক্তিগত সমস্যা, জটিলতা বা জীবন কতটা নগণ্য। এটি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। কারণ তখন আমরা অবচেতনভাবেই অনুধাবন করতে পারি যে যেসব বিষয় নিয়ে আমরা এতো বেশি মানসিক চাপে ভুগছি, সেগুলো আসলে প্রকৃতির তুলনায় ততটাও বড় কোনো সমস্যা নয়।”

ব্যস্ত নাগরিক জীবনে যখন অবসাদ আর বিষণ্ণতা আমাদের গ্রাস করছে, তখন প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত কয়েক মিনিটের জন্য হলেও সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের এই সোনালী আলোর মুখোমুখি হওয়া আমাদের মানসিক সুস্থতার জন্য একটি দারুণ থেরাপি হিসেবে কাজ করতে পারে

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 1   +   9   =