হাতের মুঠোয় ‘পকেট ক্যাসিনো’: ডিজিটাল ফাঁদে নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো পরিবার

সোহেল হাওলাদার, দৈনিক পূর্বাচল:

একসময় জুয়ার আসর বসত গোপন কোনো নির্জন ঘরে কিংবা ক্লাবের আড়ালে। তাস, পাশা কিংবা বোর্ড ঘিরে চলত ভাগ্যের খেলা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে প্রায়ই ভেঙে দেওয়া হতো সেসব আসর, গ্রেপ্তার হতো জুয়াড়িরা। কিন্তু প্রযুক্তির আগ্রাসী অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে জুয়ার চেনা চেহারা। এখন জুয়া খেলার জন্য আর নির্দিষ্ট কোনো আড্ডার প্রয়োজন হয় না। একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ আর কয়েকটি মোবাইল অ্যাপই এখন জুয়ার আসর হিসেবে যথেষ্ট।

শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এন্ড্রয়েড ফোনই এখন অনেকের কাছে ভার্চুয়াল জুয়ার বোর্ড। আর একেই বলা হচ্ছে ভয়ঙ্কর ‘পকেট ক্যাসিনো’। রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার অবাস্তব প্রলোভন দেখিয়ে এই ডিজিটাল ফাঁদ গ্রাস করছে দেশের হাজারো পরিবারকে। নিঃস্ব হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। জুয়ায় হারানো টাকা তুলতে গিয়ে কেউ জড়িয়ে পড়ছেন ঋণের ফাঁদে, কেউ আবার ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ও খুনের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে লিপ্ত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনলাইন জুয়া এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; এটি ধীরে ধীরে সামাজিক মহামারিতে রূপ নিচ্ছে।

শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামেও থাবা

কয়েক বছর আগেও অনলাইন জুয়া ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক। কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে সিলেট, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, রংপুর, কুড়িগ্রামসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মোবাইল ফোনের পর্দায় চলছে ক্রিকেট বেটিং, অনলাইন ক্যাসিনো, স্লট গেম কিংবা তথাকথিত ‘কালার প্রেডিকশন’। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টেলিগ্রাম গ্রুপ এবং বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে প্রতিদিন নতুন নতুন খেলোয়াড় যুক্ত হচ্ছে এই অন্ধকার জগতে।

প্রলোভন ও আসক্তির রূপকথা

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের এক বাসিন্দা (ছদ্মনাম সাইফুল ইসলাম) জানান, বন্ধুদের উৎসাহে প্রথমে ৫০০ টাকা দিয়ে জুয়া খেলা শুরু করেছিলেন তিনি। প্রথম দিনেই জিতে যান চার হাজার টাকা। আর এই জেতার লোভই তাকে আসক্ত করে তোলে। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে প্রায় আট লাখ টাকা হারিয়ে এখন ঋণের বোঝায় পরিবার থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ এই আসক্তির মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন, “অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় কৌশল হলো শুরুতে খেলোয়াড়কে কিছু অর্থ জিতিয়ে দেওয়া। এতে মস্তিষ্কে দ্রুত লাভের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এরপর হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় মানুষ আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে থাকে। একসময় এটি মাদকের আসক্তির মতোই নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় পৌঁছে যায়।”

প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও কোটি কোটি টাকার লেনদেন

সাইবার অপরাধ সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশে শত শত অনলাইন বেটিং ও জুয়ার প্ল্যাটফর্ম সক্রিয় রয়েছে। এগুলোর অধিকাংশই বিদেশ থেকে পরিচালিত হলেও দেশে তাদের শক্তিশালী এজেন্ট, মাস্টার এজেন্ট ও সাব-এজেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS), ব্যাংক হিসাব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতবдол ও পাচার হচ্ছে। প্রযুক্তি-নির্ভর এই নেটওয়ার্কের অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. হক বলেন, “অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় শিকার কিশোর ও তরুণরা। অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসরুম, কোচিং কিংবা গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইলে বাজি ধরছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক গভীর সামাজিক হুমকি।”

একই সুর সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহার কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখানো অধিকাংশ বিলাসী জীবনযাপন, রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার গল্প কিংবা বিশাল অঙ্কের লাভের বিজ্ঞাপন সম্পূর্ণ সাজানো ও বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে লাভবান হয় শুধু প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারীরা। অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর মাধ্যমে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সামাজিক মহামারি রুখতে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও কঠোর আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যাপক পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 2   +   3   =