বিনোদন প্রতিবেদক | ঢাকা
বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী যুগের ধুলোবালি মাখা ক্যাসেটের ফিতা কিংবা রেডিওর নস্টালজিক টিউনিং—যার সুরের ছোঁয়ায় কোটি বাঙালির কৈশোর আর যৌবন কেটেছে, সেই সুরের জাদুকর ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বীর শব্দসৈনিক আনোয়ার পারভেজের আজ প্রয়াণ দিবস। ২০০৬ সালের ১৭ জুন ঢাকার একটি হাসপাতালে ৬২ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সঙ্গীত জগতকে এক অবিস্মরণীয় আবেগে ভাসানো এই দেশপ্রেমিক সুরকারের প্রয়াণ দিবসে দেশজুড়ে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করা হচ্ছে।
আনোয়ার পারভেজ ১৯৪৪ সালে ঢাকায় এক ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা এম ফজলুল হক এবং মাতা আছিয়া হক। প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ তাঁর সহোদরা বোন এবং আশির দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রের তুমুল জনপ্রিয় রোমান্টিক অ্যাকশন হিরো জাফর ইকবাল তাঁর ছোট ভাই। এছাড়া বাংলা চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান পরিচালক ইবনে মিজান ছিলেন তাঁর মামা এবং রূপালী পর্দার পরিচিত মুখ জেসমিন পারভেজ তাঁর সহধর্মিণী।
শৈশব থেকেই সঙ্গীতের প্রতি প্রবল অনুরাগ থাকা আনোয়ার পারভেজ প্রখ্যাত মিউজিশিয়ান করিম শাহাবুদ্দিনের সান্নিধ্যে এসে নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করেন। ষাটের দশকে চট্টগ্রাম বেতারে সুরকার হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর পেশাদার সঙ্গীত জীবনের সূচনা ঘটে। পরবর্তীতে ঢাকায় এসে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন তিনি। ‘চাঁদ আওর চাঁদনী’ ও ‘বাবলু’ ছবিতে সহকারী সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করার পর, ১৯৭০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে একক সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আনোয়ার পারভেজ নিজের সুরকে মুক্তিকামী মানুষের হাতিয়ারে পরিণত করেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক হিসেবে তাঁর সুর করা “জয় বাংলা বাংলার জয়” গানটি হয়ে ওঠে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মূল প্রেরণা। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের গীতিকাব্যে এই গানটি সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের মনে অসীম সাহসের সঞ্চার করেছিল, যা পরবর্তীতে কালজয়ী ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
২০০৫ সালে বিবিসি বাংলার শ্রোতা জরিপে সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় আনোয়ার পারভেজের সুর করা ৩টি গান শীর্ষস্থানে জায়গা করে নেয়। গানগুলো হলো— ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’ এবং ‘একতারা তুই দেশের কথা বল রে এবার বল’। শাহনাজ রহমতুল্লাহর কণ্ঠে গাওয়া এই গানগুলো আজও বাঙালির ঘরের কোণে, ট্রানজিস্টরে কিংবা হেডফোনে এক অদ্ভুত একাকীত্বের নস্টালজিয়া তৈরি করে।
চলচ্চিত্রের প্লেব্যাকে সুরের জাদুকর আনোয়ার পারভেজ ছিলেন একচ্ছত্র হিট মেকার। তাঁর সুরারোপিত ‘আমি সাত সাগরের ওপার হতে’, ‘যেভাবে বাঁচি বেঁচে তো আছি’, ‘সে যে কেন এলো না কিছু ভালো লাগে না’, ‘আমি তো বন্ধু মাতাল নই’, ‘ইশারায় শিস দিয়ে আমাকে ডেকো না’, ‘আমি ধন্য হয়েছি ওগো ধন্য’ এবং ‘হয় যদি বদনাম হোক আরো’ গানগুলো বাংলা গানের ইতিহাসে মাইলফলক। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি রংবাজ, বেঈমান, দি রেইন, সাহেব বিবি গোলাম, সকাল সন্ধ্যা, অভিযান, ঘরে বাইরে, নিষ্পাপ, জীনের বাদশা ও ছুটির ফাঁদে সহ প্রায় দুই শতাধিক চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন।
সৃষ্টির তুলনায় জীবদ্দশায় যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ার এক পাহাড়সম অভিমান বুকে নিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন এই নিভৃতচারী সুরসম্রাট। মৃত্যুর পর তাঁর অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালে তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ (মরণোত্তর) ভূষিত করে। আজ আনোয়ার পারভেজ শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি ও অবিনাশী সুরের মূর্ছনা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান থাকবে।

