সাড়ে ১৭ বছরের শাসনামলে নারী নিরাপত্তা: অবকাঠামোগত উন্নয়নের আড়ালে বিচারহীনতার ভয়াল পরিসংখ্যান

বিশেষ প্রতিবেদন 

প্রতিবেদন প্রস্তুত: সোহেল হাওলাদার

ঢাকা, ২২ মে ২০২৬: বাংলাদেশে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা সাড়ে সতেরো বছরের শাসনামলে দেশের অবকাঠামো ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকে দৃশ্যমান পরিবর্তন এলেও, নারীর মৌলিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের (গণধর্ষণ) ঘটনা কেবল সংখ্যাগত দিক থেকেই বাড়েনি, বরং তা রূপ নিয়েছিল প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক ব্যাধিতে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বার্ষিক ডেটা এবং আদালতের নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাই এই পরিস্থিতির জন্য প্রধানত দায়ী।

 ‘ধর্ষণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ আন্দোলন

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর চূড়ান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর—এই ৯ মাসেই দেশে রেকর্ডসংখ্যক ৯৭৫টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে ২০৮টি ছিল দলবদ্ধ বা গণধর্ষণ। ধর্ষণের পর অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয় অন্তত ৪০ জন ভুক্তভোগীকে।

একই বছরের অক্টোবর মাসে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে বর্বরোচিত কায়দায় নির্যাতন এবং সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও সামাজিক অবক্ষয়ের চরম রূপটি উন্মোচন করে। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী “ধর্ষণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ” ব্যানারে এক অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভ ও ছাত্র-আন্দোলন গড়ে ওঠে। জনরোষের মুখে তৎকালীন সরকার দ্রুততম সময়ে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ‘যাবজ্জীবন’ থেকে বাড়িয়ে ‘মৃত্যুদণ্ড’ নির্ধারণ করে। তবে অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই কঠোর আইনও অপরাধের গ্রাফ নিচে নামাতে পারেনি।

পরিসংখ্যানের  ১৭ বছরের চিত্র

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ ও বার্ষিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত দেড় দশকে নারী নির্যাতনের প্রতিটি সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী:

  • ২০২০ সালের প্রথমার্ধ: বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৪১৬ জন নারী সরাসরি ধর্ষণের শিকার হন। যার মধ্যে ২৪ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় এবং সামাজিক ট্রমা ও লোকলজ্জার শিকার হয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন ২ জন। একই সময়ে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয় আরও ৭৯ জন নারীর ওপর।

  • ২০২১ সালের ভয়াবহতা: ২০২১ সালে এই পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। মহিলা পরিষদের নথি অনুযায়ী, ওই বছর ১ হাজার ২৩৫ জন নারী ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হন, যার মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন ১৭৯ জন। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হন ৩১ জন।

  • সামগ্রিক প্রবণতা (২০০৯-২০২৪): মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তুলনামূলক ডেটাবেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৯ সালে বার্ষিক ধর্ষণের নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা যেখানে তিন অঙ্কের ঘরে সীমিত ছিল, তা ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে প্রতি বছর গড়ে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৭০০-এর ঘরে গিয়ে পৌঁছায়।

০.১১ শতাংশ সাজার হার: দ্য গার্ডিয়ান-এর চোখ কপালে তোলা তথ্য

মানবাধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, কঠোর আইনের ঘোষণা থাকলেও মাঠপর্যায়ে অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করার হার ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়। বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian)-এর একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার এই কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রমাণ মেলে।

২০১১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশের ৬টি সুনির্দিষ্ট জেলায় দায়ের হওয়া ৪ হাজার ৩৭২টি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার চূড়ান্ত রায় ও নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মাত্র ৫টি মামলায় আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। অর্থাৎ, মামলার বিপরীতে সাজা পাওয়ার হার ছিল মাত্র ০.১১ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কতটা নিশ্চিত ছিল।

কাঠামোগত ব্যর্থতার উৎস ও বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ

সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানী ও আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত সরকারের সাড়ে ১৭ বছরের শাসনামলে নারী নিরাপত্তার এই চরম বিপর্যয়ের পেছনে ৪টি সুনির্দিষ্ট কারণ কাজ করেছে:

১. রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় সিন্ডিকেট: অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের অঙ্গ-সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিল বা তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেত। এর ফলে থানা পর্যায়ে মামলা গ্রহণে অনীহা বা ধারা দুর্বল করার ঘটনা ঘটেছে। ২. তদন্তের দুর্বলতা ও দীর্ঘসূত্রতা: পুলিশি তদন্তে দীর্ঘ সময় নেওয়া, ডিএনএ এবং ফরেনসিক ল্যাবের সীমাবদ্ধতা এবং ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিটের কারণে আসামিরা সহজেই পার পেয়ে গেছে। ৩. ভীতি ও সামাজিক অবমাননা: ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় কোনো ‘উইটনেস প্রটেকশন’ (সাক্ষী সুরক্ষা) ব্যবস্থা না থাকায়, সামাজিক চাপ ও হুমকির মুখে অনেক পরিবার মাঝপথেই আইনি লড়াই থেকে পিছু হটেছে। ৪. উন্নয়নের ভ্রান্ত ধারণা: রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও বড় বড় মেগা প্রজেক্টের উন্নয়নকে সামনে আনলেও, একটি সভ্য সমাজের অন্যতম প্রধান সূচক—অর্থাৎ ‘নারীর অবাধ ও নিরাপদ বিচরণ’ নিশ্চিত করার টেকসই উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

 সম্পাদকীয় অবস্থান:

সরকার বা ক্ষমতার পরিবর্তনই নারী নিরাপত্তার একমাত্র সমাধান নয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়কে বিবেচনা না করে দ্রুততম সময়ে—বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে—দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নারীর ওপর এই মধ্যযুগীয় বর্বরতা থামানো সম্ভব নয়। একই সাথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং শিক্ষা ও পরিবারিক স্তরে নৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 1   +   7   =