শিশুমৃত্যুর দায় কার?

বিয়ের ১১ বছর পর কোল জুড়ে আসা আট মাস বয়সি চাঁদপুরের শিশু তাজিম গত ২২ এপ্রিল প্রাণ হারায় হামে। মৃত সন্তান কোলে ফারজানা-হেলাল দম্পতির সেদিনের বুকফাটা কান্নার ছবি দেখে চোখের পানি আটকাতে পারেনি দেশবাসী। হাম আর উপসর্গে প্রাণ হারানো শিশুগুলোর পরিবারের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল এবারের মা দিবস। গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৫৮ দিনে এভাবেই ঝরে গেছে ৪১৫ শিশুর প্রাণ। হাসপাতালে লড়াই করতে হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৮০ শিশুকে।

 

দেশব্যাপী হামের এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, অনেকটাই মহামারি পর্যায়ে চলে গেছে। সরকারের জরুরি টিকাদান কর্মসূচি ও পদক্ষেপের মধ্যেই আরো কত শিশু প্রাণ হারাবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। প্রশ্ন উঠছে এত শিশুর মৃত্যুর জন্য দায়ী কে, কারা? এসব বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে উঠে এসেছে ভীতিকর তথ্য। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা কেনার পুরো ব্যবস্থা বদলে ফেলা, ভিটামিন এ, বুকের দুধ ও কৃমিনাশকের ঘাটতি, সর্বোপরি ইউনিসেফের দফায় দফায় সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার কারণেই হামের সংক্রমণ মৃত্যুর মিছিলে পরিণত হয়েছে। যে ভুলের মাশুল দিতে হচ্ছে কচি প্রাণগুলোকে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করছেন টিকার সংকটের কারণে হাম পরিস্থিতির চরম অবনতির জন্য দায়ী মূলত অন্তর্বর্তী সরকার। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রয়োজন ছাড়াই উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্তের ফলে হামের বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নিজ উদ্যোগেই শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত।’

তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তের কাছে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে প্রথম হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। কেউ সেদিকে গুরুত্ব না দেওয়ায় মার্চের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। বর্তমানে ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই ছড়িয়ে পড়েছে হাম। প্রতিদিনই হাম ও উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে অসংখ্য শিশু। প্রাণ হারাচ্ছে অনেকে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার গত ৬ মে হাম-রুবেলা, ওরাল পোলিওসহ ১০ ধরনের টিকার চালান এনেছে দেশে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, ১৫ লাখ ডোজ হামের টিকা দেশে এসেছে। আরো ১০ ধরনের ১ কোটি ৮ লাখ ডোজ টিকা আনার তথ্য জানিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে টিকার আর সংকট হবে না।

তবে মাঠের চিত্র ভিন্ন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকে নিয়ে সচেতনতা কমেছে। রাজধানীর অনেক বস্তিতে শিশুদের টিকা দিতে অভিভাবকদের অনাগ্রহী দেখা গেছে। টিকা দিলে শিশু মারা যায় বলে গুজবও ছড়ানো হয়েছে। যে কারণে সরকারের টিকাদান কর্মসূচি খানিকটা ব্যাহত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা বা জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি ছিল না। ব্র্যাকের মতো বেসরকারি সংস্থা কিছু কাজ করলেও তা থেকেছে সীমিত পরিসরে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর টিকা সংগ্রহের পুরোনো পদ্ধতি বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করেছিল। সে সময় ইউনিসেফের কর্মকর্তারা একাধিকবার সরকারের উচ্চপর্যায়ে সতর্ক করে জানিয়েছিলেন, নতুন সিদ্ধান্ত ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। টিকা সংগ্রহে ১২ মাস বিলম্ব ঘটবে। ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকেও বারবার সতর্ক করেছিলেন। তবে কেউ শোনেননি তার কথা।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গেল মার্চ মাসে কেন্দ্রীয় গুদামে হাম-রুবেলাসহ ১০টি রোগের টিকার মজুত শূন্যে নামে। যে মাসে সারা দেশে ৪১ শিশু প্রাণ হারায়। এক সাক্ষাত্কারে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রতি দফায় বৈঠকের পরপরই চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি, রোগের প্রাদুর্ভাব, মৃত্যুহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে কেউই সেসব সতর্কবার্তা আমলে নেয়নি। এমনকি জাতীয় টিকাদান পরামর্শক কমিটিও আজ থেকে দেড় বছর আগে হাম নিয়ে সতর্ক করেছিল। তবে সে সতর্কবার্তাও উপেক্ষিত হয়েছে।

অবশ্য, দেশের বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক জরুরি ভিত্তিতে ১৫ লাখ ডোজ হামের টিকার ক্যাম্পেইন চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্র্যাক স্বাস্থ্য কর্মসূচির অধীনে লিড, রুরাল প্রাইমারি হেলথকেয়ার হিসেবে কর্মরত মেহেদী হাসান। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্র্যাকের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, জাতীয় টিকাদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে একটি বেসরকারি সংস্থার পক্ষে এত বড় সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব।’ বিশ্লেষকদের মতে, ব্র্যাকের টিকাদান প্রশংসনীয় হলেও ২ কোটি শিশুর তুলনায় এটি নগণ্য।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা-সংকটের সঙ্গে আরো বহুমুখী সংকটের কারণেও হাম ও উপসর্গে শিশুমৃত্যু বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২৭টি জেলায় স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ দেওয়া হলেও বাকি ৩৭ জেলায় মাঠপর্যায়ে ৪৫ শতাংশ কর্মীও নেই। এর ওপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য সহকারীরা অন্তত তিন দফায় কর্মবিরতিতে গিয়েছিলেন। তাতে সারা দেশে টিকা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া নয় মাস ধরে বেতন বঞ্চিত ছিলেন টিকা বহনের কাজ করা ১ হাজার ৩২৬ পোর্টার। সে সময় ইপিআইয়ের পরিচালকের পদ শূন্য থাকায় সংকট ঘনীভূত হয়েছিল।

অন্যদিকে, টিকার ঘাটতির সুযোগে হামে শিশু মৃত্যুর মিছিলকে দীর্ঘায়িত করেছে পুষ্টিহীনতা। সর্বশেষ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (২০২২) অনুযায়ী, ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ খায় এমন শিশুর হার চার বছর আগে ছিল ৬৫ শতাংশ। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৫৩ শতাংশে। ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ জানান, গেল ২০২৫ সালে সেই হার আরো কমে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বলা যায়, প্রতি দুই শিশুর একজন প্রয়োজনীয় মায়ের দুধ পাচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেনের মতে, শিশুদের ওপর একের পর এক অন্যায় করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন নেই, মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর পক্ষে প্রচারণা নেই, কৃমিনাশক ঠিকমতো খাওয়ানো হয়নি। এসব কারণে শিশুদের অপুষ্টি বেড়েছে। পুষ্টিহীন শিশুরা টিকা না পেয়ে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে বিপজ্জনক অবস্থা চলে গেছে। যার পরিণতি হামের প্রাদুর্ভাব, মৃত্যুর মিছিল।’

আবার সারা দেশে হাসপাতালে ভর্তি হতে আসা শিশুদেরও সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবাও দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের ঘাটতির কারণে। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, ‘হাসপাতালে শিশুদের আনা হচ্ছে অনেক জটিলতা হওয়ার পর। লাইফ সাপোর্ট দিয়েও বাঁচানো যাচ্ছে না।’

সরকারের দ্রুত ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করা জরুরি বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, মৌখিক নির্দেশ নয়, এই মুহূর্তে করণীয় হলো যতগুলো শিশুর আইসিইউতে যাওয়া দরকার সবাইকে আইসিইউতে দিতে হবে, কোনো কথা নাই। প্রয়োজনে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর আইসিইউ অধিগ্রহণ করতে হবে। একটা শিশুও যাতে আইসিইউর অভাবে মারা না যায়। প্রয়োজনে স্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হোক। তাহলে আর্মি, বিডিআর, পুলিশ, প্রাইভেট খাত সবাই এগিয়ে আসবে। বিদেশিরাও এগিয়ে আসবে। এছাড়া ম্যানেজমেন্ট পরিবর্তন করতে হবে। আগে যা ছিল সেভাবে চললে আরো মৃত্যু দেখে যেতে হবে।

এ বিষয়ে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘শুধু ক্যাম্পেইননির্ভর না হয়ে রুটিন টিকাদান কর্মসূচি আরো শক্তিশালী করতে হবে।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, ‘ইতিমধ্যে ছয় মাস বয়স থেকেই হামের টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনার কাজ চলছে।’

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 0   +   7   =