ভালোবাসার শেষ পরিনতি

সিঙ্গাইর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি | 

মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলায় নিখোঁজের ছয় দিন পর মারিহা মাহি (১৪) নামে এক স্কুলছাত্রীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সায়াহ্ন রূপ নিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ সাতজনকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনার সত্যতা ও নেপথ্যের কারণ জানতে বর্তমানে তাদেরকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এদিকে আজ সোমবার (২২ জুন) দিনভর নিখোঁজ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী কথিত প্রেমিক আলিফ ও তার স্বজনদের বাড়িঘরে কয়েক দফায় ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে। এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

নিহত মারিহা মাহি সিঙ্গাইর উপজেলার সায়েস্তা ইউনিয়নের চর লক্ষীপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয় সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

টিসি প্রদান ও নিখোঁজের সূত্রপাত

পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ১০ জুন বিদ্যালয়ের মধ্যাহ্ন বিরতির সময় একটি শ্রেণিকক্ষে দশম শ্রেণির ছাত্র আলিফ ও অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী মাহির আপত্তিকর আচরণের অভিযোগ ওঠে। বিদ্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনাটি ধারণ হলে ১৩ জুন বিষয়টি শিক্ষকদের মধ্যে জানাজানি হয় এবং এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।

এ বিষয়ে সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিত বিষয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল কাদির জানান, সিসিটিভি ফুটেজের ঘটনার পর গত ১৫ জুন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের ডেকে স্ট্যাম্পে মুচলেকা নেয় এবং উভয় শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলক স্থানান্তর সনদ (টিসি) প্রদান করে। ওই দিন উভয় শিক্ষার্থীর মায়েরা উপস্থিত ছিলেন। পরের দিন উভয় পরিবার স্কুল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করে বলে, “আমরা তাদের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করে দেব, আপনারা টিসিটি তুলে নিন।” তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দেয়, যেহেতু তাদের বয়স কম, তাই আইনগতভাবে বিদ্যালয়ের কিছু করার নেই। পরিবার চাইলে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিতে পারে। এই ঘটনার পর থেকেই মাহি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়।

পরদিন মাহির পরিবার তাকে খুঁজে না পেয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে বিষয়টি অবহিত করে। কিন্তু সেখান থেকে সন্তোষজনক কোনো সুরাহা না পেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি ও অভিযোগ দায়ের করে পরিবার। এরপর থেকেই পুলিশ তার সন্ধানে অভিযান চালিয়ে আসছিল।

নিখোঁজের পর মুক্তিপণ দাবি

মাহির ফুফাতো ভাই অভিযোগ করে বলেন, “মাহির মরদেহ উদ্ধারের ঠিক আগের রাতে ৩-৪ জন যুবক মাহির মাকে ফোন দিয়ে দাবি করে যে মাহির সন্ধান পাওয়া গেছে। সন্ধান দেওয়ার নাম করে তারা ১০ হাজার টাকা দাবি করে। তখন মাহির মা তাদের বিকাশ বা নগদে ৫ হাজার টাকা দেন এবং বাকি টাকা নিয়ে সাহরাইল বাজারে আসেন। তারা যুবকদের কাছে মাহির অবস্থান জানতে চাইলে তারা রাত ১২টা থেকে ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করায়। পরে মাহির কোনো সন্ধান না দিয়ে ওই তিন যুবক জানায় যে তারা চেষ্টা করছে, দু-একদিনের মধ্যেই সন্ধান এনে দেবে।”

ঝোপঝাড় থেকে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার

অবশেষে গত রোববার (২১ জুন) সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপজেলার চন্দননগর এলাকার একটি কাঠবাগান ও কবরস্থানের পাশের নির্জন ঝোপঝাড়ে স্কুল ড্রেস ও ব্যাগসহ একটি খণ্ডিত, অর্ধগলিত মরদেহ দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে সিঙ্গাইর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

এ ঘটনায় নিহত ছাত্রীর মা কামরুন্নাহার বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে সিঙ্গাইর থানায় একটি লিখিত মামলা দায়ের করেছেন।

প্রধান শিক্ষকসহ আটক ৭

মামলা ও জিজ্ঞাসাবাদের অংশ হিসেবে পুলিশ এখন পর্যন্ত ৭ জনকে আটক করেছে। আটক ব্যক্তিরা হলেন—উপজেলার কানাইনগর গ্রামের রাজিব (ছদ্মনাম), তার বোন আয়েশা আক্তার (২১), রুমা আক্তার (৩৫), সাহরাইল গ্রামের মৃত ছালাম খানের ছেলে মাসুদ হোসেন (৩৫), আবুল হোসেনের ছেলে রাসেল হোসেন (২৫), সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম (৬০) এবং আইসিটি শিক্ষক ইয়াকুব মোল্লা (৩৫)।

পুলিশ যা বলছে

এ বিষয়ে সিঙ্গাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, “নিহত স্কুলছাত্রীর মরদেহের একটি অংশ গাছের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল এবং বাকি অংশ নিচে পড়ে ছিল। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।”

তিনি আরও বলেন, “ঘটনার বিভিন্ন দিক অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রধান শিক্ষকসহ সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তে ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততা না পাওয়া গেলে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 10   +   5   =