বেনজীরের বেপরোয়া উত্থান ও ট্রাজিক পতন

প্রকাশের তারিখ: ১৫ জুন, ২০২৬

প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছেন: সোহেল হাওলাদার, নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল

ক্ষমতার দম্ভে যিনি নিজেকে ‘আইনের চেয়েও বড়’ ভাবতেন, সেই RAB সাবেক ডিজি বেনজীর আহমেদের উত্থান, বেপরোয়া দম্ভ ও দুবাইয়ে গ্রেফতারের ভেতরের গল্প নিয়ে সোহেল হাওলাদারের বিশেষ বিশ্লেষণ।

বিশেষ বিশ্লেষণ (ঢাকা) — গতকাল দেশের সব গণমাধ্যমে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে গ্রেফতারের খবরটি চওড়া হেডিংয়ে এসেছে। কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে যারা গত এক দশক বেনজীরকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের কাছে এই গ্রেফতার কেবল একটি Cosmic জাস্টিস বা ব্যক্তির আটক হওয়া নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, সীমাহীন ব্যক্তিক দম্ভ এবং অবশম্ভাবী পতনের এক ক্লাসিক রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি। একসময়  (RAB) মহাপরিচালক ও পুলিশের আইজিপি হিসেবে যিনি নিজেকে ‘আইনের চেয়েও বড়’ এবং তৎকালীন শাসক দলের সমার্থক বানিয়ে ফেলেছিলেন, সেই বেনজীর আহমেদকে আজ দুবাইয়ের নির্জন সেল থেকে বাংলাদেশের আদালতের কাঠগড়ার দিকে চেয়ে থাকতে হচ্ছে

টুঙ্গিপাড়া কার্ড ও বেপরোয়া উত্থান

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার আঞ্চলিক পরিচয়কে বেনজীর আহমেদ পেশাগত যোগ্যতার চেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ২০১০ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তিনি সিভিল সার্ভিসের নিরপেক্ষতার খোলস ভেঙে পুরোপুরি দলীয় ক্যাডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের অপারেশন ছিল তাঁর ক্ষমতার প্রথম বড় পরীক্ষা। এরপর ২০১৫ সালে (RAB) মহাপরিচালক (ডিজি) হওয়ার পর তাঁর ক্ষমতা আর কোনো লাগাম মানেনি। RABকে তিনি ব্যবহার করেছেন বিরোধী রাজনৈতিক দল দমন, ভিন্নমত স্তব্ধ করা এবং নিজের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য বিস্তারের ঢাল হিসেবে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মূল কারিগর ছিলেন তিনি, যার ফলশ্রুতিতে ২০২১ সালে তাঁর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসে। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞাকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর দম্ভ ছিল তাঁর

ক্ষমতার দম্ভ: “আওয়ামী লীগের চেয়েও বড় আওয়ামী লীগার”

বেনজীর আহমেদের দম্ভ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, অনেক সময় তিনি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তকেও তোয়াক্কা করতেন না। প্রশাসনের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ আমলারা তাঁর সামনে কথা বলতে ভয় পেতেন। ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচন সফল করার মূল মাস্টারমাইন্ড হিসেবে তিনি নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও অপরিহার্য ভাবা শুরু করেন। এই দম্ভের কারণেই তিনি দেশজুড়ে এক ‘অবৈধ সম্পদের স্বর্গরাজ্য’ গড়ে তোলেন। বিঘার পর বিঘা জমি দখল, সাধারণ মানুষের সম্পদ গ্রাস, সাভারে আলিশান রিসোর্ট আর শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচার—সবই তিনি করেছেন এই বিশ্বাস থেকে যে, ‘এই দেশে তাঁকে ছোঁয়ার ক্ষমতা কারও নেই’। সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হলে চরম ঔদ্যত্য ও ব্যাঙ্গাত্মক হাসি দিয়ে তিনি তা উড়িয়ে দিতেন

ট্রাজিক পতন: যখন ছায়া সরে গেল

বেনজীর আহমেদের পতনের প্রথম অধ্যায় শুরু হয় ২০২৪ সালের মাঝামাঝি, যখন তাঁর বিপুল দুর্নীতির খতিয়ান গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। তৎকালীন সরকার যখন বুঝতে পারে বেনজীরের পাপের বোঝা আন্তর্জাতিকভাবে তাদেরও ডুবিয়ে দিচ্ছে, তখন তাঁর ওপর থেকে অলিখিত ‘ছায়া’ তুলে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৪ মে দুদকের ফাঁদ এড়াতে সপরিবারে সিঙ্গাপুর পালিয়ে যাওয়ার সময় বেনজীর প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন, দম্ভের প্রাসাদ কতটা ভঙ্গুর

গত বছরের ১১ এপ্রিল ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির পর থেকেই তিনি মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আর এই ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী’ ও ‘অর্থ পাচারকারীকে’ আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি

সর্বশেষ আপডেট: দুবাই থেকে প্রত্যর্পণ কোন পথে?

গত ১২ জুন দুবাইয়ে আবুধাবি ফেডারেল ক্রাইমিনাল পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর বেনজীর এখন আরব আমিরাতের আইনি হেফাজতে আছেন। ঢাকার কূটনৈতিক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র নিশ্চিত করেছে, গতকাল ১৪ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদের বক্তব্যের পর আজ (১৫ জুন) থেকেই প্রত্যর্পণ (Extradition) প্রক্রিয়া দ্রুততর করার কাজ শুরু হয়েছে। আরব আমিরাতের আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের যে সময়সীমা রয়েছে, তার আগেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দুদকের চার্জশিট এবং আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানার সমস্ত নথি আবুধাবিতে পাঠানো হচ্ছে

একসময়ের প্রতাপশালী  (RAB) প্রধান, যার বুটের শব্দে কাঁপত ঢাকা, আজ তিনি দুবাইয়ের বন্দিশালায় বাংলাদেশের বিমানের টিকিট কাটার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। দম্ভের এই পতন বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্য আমলা এবং#ক্ষমতাশালীদের জন্য এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। 

#BenjirAhmed #RABExDG #দম্ভেরপতন #দুবাইগ্রেফতার #RAB #DainikPurbachal

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 6   +   5   =