বাংলাদেশে মাজার ভাঙচুর: বাড়ছে উদ্বেগ, প্রশ্নে ধর্মীয় সম্প্রীতি

দৈনিক পূর্বাচল

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

স্টাফ রিপোর্টার |

ঢাকা: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে মাজার ও দরগাহকেন্দ্রিক ভাঙচুর, হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং উত্তেজনা সৃষ্টির ঘটনায় নতুন করে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে একদল উগ্রপন্থী ও মব জাস্টিস (Mob Justice)-এর শিকার হচ্ছে দেশের শত বছরের পুরোনো সুফি ঐতিহ্য। সর্বশেষ গত ১৪ই মে (বৃহস্পতিবার) মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী হজরত শাহ আলী বাগদাদী (রহ.) মাজারে ওরশ চলাকালে অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
স্থানীয় প্রশাসন, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু ধর্মীয় স্থাপনার ক্ষতি নয়—বরং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্প্রীতি, সহনশীল সংস্কৃতি ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যও এক বড় হুমকি।

দেশজুড়ে মাজার ভাঙার হিড়িক: সর্বশেষ মিরপুরে তাণ্ডব

গত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাজার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের একের পর এক খবর আসছে। মাঠপর্যায়ের চিত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য জনমনে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে।

  1. মিরপুরের শাহ আলী মাজারে মধ্যরাতে হামলা: গত ১৪ই মে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে মিরপুরের হজরত শাহ আলী বাগদাদীর (রহ.) মাজারে সাপ্তাহিক ওরশ ও জিয়ারত চলাকালে লাঠিসোঁটা হাতে অর্ধশতাধিক লোক ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর ও জিয়ারতকারীদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায়। এতে বেশ কয়েকজন মাজারভক্ত গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় মাজারের নিয়মিত দর্শনার্থী রেশমি বেগম বাদী হয়ে ৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১০০ থেকে ১৫০ জনের বিরুদ্ধে শাহ আলী থানায় মামলা দায়ের করেছেন। এজাহারে হামলাকারীদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হলেও অভিযুক্ত দলটির পক্ষ থেকে তা সম্পূর্ণ ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে এই মামলার এজাহারভুক্ত আসামিসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং আদালত তাদের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

  2. নারায়ণগঞ্জে হামলা ও অগ্নিসংযোগ: মাজার ভাঙার চলমান সিলসিলায় বড় ধরনের আঘাত এসেছে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মদনপুর এলাকায় অবস্থিত দেওয়ানবাগ মাজারে। একদল লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে মাজারে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে বাধা দিতে গিয়ে মাজারের চারজন কর্মী আহত হন। স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, “সর্বশ্রেণির মাজার ও পীর বিদ্বেষী লোকজন এই হামলা চালিয়েছে।” এর আগে সোনারগাঁ উপজেলার ‘আয়নাল শাহ দরগা’ নামের একটি পুরোনো মাজারও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

  3. সিরাজগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁওয়ে মাজার تছনছ: সিরাজগঞ্জের কাজিপুর ও সদর উপজেলায় ‘ইসমাইল পাগলার মাজার’ এবং ‘আলী পাগলার মাজার’ ভেঙে ফেলা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, টুপি-পাঞ্জাবি পরিহিত একদল তরুণ হাতুড়ি ও শাবল দিয়ে মাজারের দেয়াল ও ছাউনি ভেঙে ফেলছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হামলার পর দানবাক্স ও খাদেমের ঘর থেকে টাকা-পয়সাও লুট করা হয়েছে। অন্যদিকে, ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো ‘বিবি সখিনার মাজার’ রাতের আঁধারে খুঁড়ে তছনছ করার খবর পাওয়া গেছে।

  4. সিলেটে উরুসে গান-বাজনা ও মাদক নিষিদ্ধ: সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সিলেটের ঐতিহাসিক হজরত শাহপরান (রহ.) মাজার কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়েছে যে, উরুসে কোনো ধরনের গান-বাজনা বা বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। মাজারের খাদিমরা জানান, গান-বাজনার আড়ালে মূলত মাদক ব্যবসা চালানো হচ্ছিল, যা প্রতিরোধে এলাকাবাসী ও মাজার কর্তৃপক্ষের এই যৌথ সামাজিক উদ্যোগ।

  5. ফেসবুক ইভেন্ট খুলে মাজার ভাঙার হুমকি: সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অপরাধীরা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রকাশ্যে সংগঠিত হচ্ছে। আগামী ১১ই সেপ্টেম্বর ঢাকার গুলিস্তানে অবস্থিত বিখ্যাত ‘গোলাপশাহ মাজার’ ভাঙার ঘোষণা দিয়ে ফেসবুকে একটি ইভেন্ট খোলা হয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ সাড়া দিয়েছে।


কেন বাড়ছে এই সহিংসতা?

ধর্মীয় ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, মাজারকেন্দ্রিক মতাদর্শিক বিরোধ এ দেশে নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধর্মীয় ঘরানার মধ্যে এ বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মব কালচারের উত্থান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে উত্তেজনা দ্রুত সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। মূলত কয়েকটি কারণকে এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে:

  1. ধর্মীয় ব্যাখ্যা নিয়ে তীব্র মতবিরোধ: ইসলামের মৌলিক বিধান অনুযায়ী কবর পাকা করা বা গম্বুজ নির্মাণের বৈধতা নিয়ে স্কলারদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

  2. উগ্রবাদী চিন্তাধারার বিস্তার ও ভুল তথ্যের প্রভাব: তরুণদের একটি বড় অংশকে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করে উসকে দেওয়া হচ্ছে।

  3. মাজারকেন্দ্রিক অসামাজিক কার্যকলাপ: অনেক মাজারে গান-বাজনার আড়ালে মাদক সেবন, প্রতারণা ও অর্থ উপার্জনের ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে, যা স্থানীয় ধার্মিক জনগোষ্ঠীর একাংশকে ক্ষুব্ধ করে তুলছে।

  4. স্থানীয় প্রভাব বিস্তার ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব: ধর্মীয় আবরণের আড়ালে অনেক জায়গায় জমি বা দানবাক্সের নিয়ন্ত্রণ নিতে স্থানীয় প্রভাবশালীরা এই সুযোগ ব্যবহার করছে।

মিরপুরের মাজার প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে বিশিষ্ট সমাজ বিশ্লেষক ও চিন্তকরা বলছেন,

“ধর্মীয় বিতর্ক বা ক্ষোভ থাকতেই পারে, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মাজার ভাঙচুর বা সাধু-ভক্তদের ওপর হামলা চালানো কখনো সমাধান নয়। শক্তি প্রয়োগ বা সহিংসতা সমাজকে শুদ্ধ করতে পারে না, বরং অস্থিরতা তৈরি করে। প্রতিটি মাজারে অবিলম্বে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং হামলাকারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”


যা বলছেন ইসলামিক স্কলাররা

আদর্শগত বিরোধ থাকলেও মাজার ভাঙার এই হিংস্র প্রবণতাকে পুরোপুরি ‘অনৈসলামিক’ ও ‘অন্যায়’ বলে আখ্যা দিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। সংস্থার হালাল সনদ বিভাগের উপপরিচালক মো. আবু সালেহ পাটোয়ারী বলেন:

“ইসলামের দৃষ্টিতে কবর পাকা করা বৈধ না হলেও, তার ওপর ভিত্তি করে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে আক্রমণ করতে পারে না। আমাদের কাজ হলো কোনটা বৈধ আর কোনটা অবৈধ তা প্রচার করা; কিন্তু মাজার ভাঙার অনুমতি ইসলাম কাউকে দেয়নি। কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগলে তাকে আইনের দ্বারস্থ হতে হবে।”


পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিরাজগঞ্জ ও মিরপুরসহ বেশ কিছু সংবেদনশীল এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গুজব ছড়ানো এবং ফেসবুকের উসকানিমূলক ইভেন্টগুলোর ওপর সাইবার নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।


ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা ও উত্তরণের উপায়

বাংলাদেশের ইতিহাস গবেষকরা বলছেন, বাংলার সংস্কৃতিতে সুফি ঐতিহ্যের প্রভাব দীর্ঘদিনের। ফলে হঠাৎ করে এই সংঘাতময় পরিবেশ তৈরি হলে তা দেশের দীর্ঘদিনের ধর্মনিরপেক্ষ ও সহনশীল ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এটি বড় ধরনের সামাজিক ও গোষ্ঠীগত দাঙ্গায় রূপ নিতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞরা কিছু জরুরি পদক্ষেপের তাগিদ দিয়েছেন:

১. ধর্মীয় সহনশীলতা বিষয়ে ব্যাপক প্রচার: মসজিদ ও গণমাধ্যমে আইন নিজের হাতে না নেওয়ার ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

২. আইনের কঠোর প্রয়োগ: যারা মাজার ভাঙচুর বা লুটপাটে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তাদের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা।

৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি: ফেসবুকের উসকানিমূলক ইভেন্ট ও পেজগুলো বন্ধে বিটিআরসির দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।

৪. স্থানীয় পর্যায়ে সংলাপ ও সংস্কার: মাজারের খাদেম, এলাকাবাসী এবং স্থানীয় আলেমদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে মাজারের অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধ করা, ইজারা প্রথা সংস্কার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

উপসংহার

বাংলাদেশ বহু ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতির সহাবস্থানের দেশ। মতপার্থক্য বা আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও শান্তিপূর্ণ উপায়ে তা সমাধান করাই এ দেশের ঐতিহ্য। ধর্মকে ঢাল বানিয়ে মাজার ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির এই অপচেষ্টা এখনই কঠোর হস্তে দমন করা না গেলে দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা হুমকিতে পড়বে—এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 3   +   2   =