বিশেষ প্রতিবেদক |
তদন্তের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে নাম বদলে আত্মগোপন করেছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পিরোজপুর জেলার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার হাওলাদার। বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবৈধ পথে ভারতে পাড়ি জমান তিনি। বর্তমানে তিনি কলকাতার অভিজাত এলাকা নিউটাউনের “আইডিয়াল ভিলা” আবাসনের ১২০ নম্বর ভবনের প্রথম তলায় বসবাস করছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে একাধিক দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের মামলার এই ফেরারি আসামি ভারতে গিয়ে নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘মোঃ সামাদ আলী সরদার’ নাম ধারণ করেছেন। শুধু নিজের নামই নয়, জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি তাঁর স্ত্রী রিনা পারভীন এবং ছেলে এইচ এম মঞ্জরুল-এর নামও পরিবর্তন করে ভারতের নাগরিকত্ব সনদ (আধার কার্ড) ও অন্যান্য বৈধ কাগজপত্র তৈরি করেছেন।
কাজ ছাড়াই ৬ হাজার কোটি টাকার বিল ও শত কোটি টাকা লোপাট!
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পিরোজপুর জেলায় কর্মরত থাকাকালীন প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার হাওলাদার একটি বিশেষ প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ১৭ শত টেন্ডারের বিপরীতে কোনো বাস্তব কাজ না হওয়া সত্ত্বেও, কোনো বৈধ বিল ভাউচার ছাড়াই শুধুমাত্র বিল স্লিপের মাধ্যমে ৬ হাজার কোটি টাকার বিল ছাড় করেন তিনি। এই বিশাল অংকের অর্থ ছাড়ের বিনিময়ে পার্সেন্টেজ বা কমিশন বাবদ শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেন সাবেক এই প্রকৌশলী। তাঁর এই দুর্নীতির কারণে পিরোজপুর জেলার সাধারণ ও প্রকৃত ঠিকাদাররা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং জেলার সামগ্রিক উন্নয়ন কাজ সম্পূর্ণ মুখ থুবড়ে পড়েছে।
কলকাতায় হুন্ডির টাকা ও মাছের ঘের
কলকাতার একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, ‘আসফাক’ নামের এক ব্যক্তির (যার ভারতীয় মোবাইল নম্বর: ৯৬০৯২১৯২৮০) সহায়তায় আব্দুস সাত্তার হাওলাদার বাংলাদেশ থেকে প্রায় শত কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাচার করেছেন। বর্তমানে সেই আসফাকের আশ্রয়েই তাঁর পরিবার বসবাস করছে। পাচারকৃত এই অর্থ দিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গে বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করে বড় আকারের মাছের ঘের ব্যবসা শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে তিনি ভারতে ৮২৯৩৮০০৪১৯, ৭৮৬৪৮৫৪৭৪১ ও ৯০৫১৭৪০১২৯ নম্বরগুলো ব্যবহার করছেন এবং তাঁর বাংলাদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটি (+৮৮০১৭১৫০১৬৮১০) এখনো সক্রিয় রয়েছে।
যৌথ কার্গো ব্যবসা ও নেপথ্যের সহযোগীরা
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পিরোজপুরে চাকুরীকালীন সময়ে তিনি নেসারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রভাবশালী ঠিকাদার সফিক সুমনকে কাজ না করা সত্ত্বেও অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার বিল প্রদান করেন। এই সুমনের সাথে আব্দুস সাত্তার হাওলাদারের যৌথ মালিকানায় “কার্গো পরিবহন ও বাল্কহেড জাহাজ”-এর বড় ধরণের ব্যবসা রয়েছে বলেও জানা গেছে।
দুদকের মামলা ও দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি
ইতিমধ্যেই এই প্রকৌশলীর অঢেল অবৈধ সম্পদের খোঁজে এবং জালিয়াতির অভিযোগে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক মামলা দায়ের করেছে। দেশের মূলধারার গণমাধ্যমেও তাঁর এই বিপুল দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়েছে। পিরোজপুরের ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদার সাধারণ মানুষ এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে অনতিবিলম্বে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার (ইন্টারপোল বা প্রত্যর্পণ চুক্তি) মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

