চুয়াডাঙ্গায় কিশোর রাফিজ হত্যা: প্রধান আসামি লাল্টু গ্রেফতার, আদালতে স্বীকারোক্তি

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি:

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণের জন্য অপহৃত কিশোর রাফিজ মিয়াকে শ্বাসরোধে হত্যার প্রধান আসামি লাল্টু মিয়াকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি। বিস্তারিত পড়ুন।

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে অপহরণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ১৫ বছর বয়সী কিশোর রাফিজ মিয়াকে। দীর্ঘ তদন্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর অভিযানের মাধ্যমে ঘটনার প্রধান আসামি লাল্টু মিয়াকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের পর আদালতে তিনি দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তার দেখানো মতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রশিও উদ্ধার করা হয়েছে।

১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি ও হুমকি
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আলমডাঙ্গা উপজেলার চিলাভালকী গ্রামের বাসিন্দা মোছা. আমেনা খাতুনের নাতি রাফিজ মিয়াকে গত ৫ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে যায় অপহরণকারীরা। এরপর তাকে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে রাত ১১টার দিকে পরিবারের সদস্যদের কাছে ফোন করে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।

ফোনে রাফিজের কান্নাজড়িত কণ্ঠ শোনানো হয় এবং বিষয়টি কাউকে জানালে তাকে জবাই করে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ১০ জুন আলমডাঙ্গা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার পর চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খানের নির্দেশনায় সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল (সিসিআইসি) ও আলমডাঙ্গা থানার যৌথ টিম তদন্ত শুরু করে।

রাজবাড়ী থেকে প্রধান আসামি লাল্টু গ্রেফতার
তদন্তের একপর্যায়ে রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি থানার নলিয়া গ্রাম রেলস্টেশন জামালপুর বাজার এলাকা থেকে মামলার প্রধান আসামি লাল্টু মিয়া (৪১)কে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ তথ্য।

আসামিরা জানতে পারে যে রাফিজের বাবা দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে রয়েছেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা করে তারা।

শ্বাসরোধ করে হত্যা ও মরদেহ খালে লোপাট
পরিকল্পনা অনুযায়ী রাফিজকে মোটরসাইকেলে করে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর এলাকার অর্জুন খালের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার হাত-পা বেঁধে নির্যাতন চালানো হয় এবং তার নিজের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। কিন্তু পরিবারের পক্ষে দাবি করা অর্থের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।

এরপর ৫ জুন রাত সাড়ে ১১টার দিকে অপহরণকারীরা রশি দিয়ে শ্বাসরোধ করে রাফিজকে হত্যা করে। পরে তার মরদেহ অর্জুন খালে ফেলে রেখে যায়। হত্যার পরও অপহরণকারীরা একাধিকবার ফোন করে মুক্তিপণের টাকা দাবি অব্যাহত রাখে, যাতে পরিবারের সদস্যরা বুঝতে না পারে যে রাফিজকে ইতোমধ্যেই হত্যা করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ১৩ জুন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর এলাকার লাল ব্রিজ মাঠ সংলগ্ন অর্জুন খালের পাশে একটি পুকুর থেকে রাফিজ মিয়ার পচাগলা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

আদালতে দোষ স্বীকার
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃত আসামির দেখানো মতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রশি উদ্ধার করা হয়েছে এবং তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। মামলার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড আবারও প্রমাণ করল, মুক্তিপণের লোভ কতটা নিষ্ঠুর ও অমানবিক অপরাধের জন্ম দিতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানের ফলে আলোচিত এ মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 2   +   5   =