খুলনায় সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া

খুলনায় কোনোভাবেই সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। একের পর এক হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই ও নীরব চাঁদাবাজির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি এবং ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নাগরিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

 

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় তিন থেকে চারটি মোটরসাইকেলে ছয়-সাত জন সন্ত্রাসী ফিল্মি স্টাইলে আজিজুল ইসলাম (৩৮) নামে এক যুবককে ধরে নিয়ে খুলনা মহানগরীসংলগ্ন বটিয়াঘাটা উপজেলার রাঙ্গেমারী এলাকার নির্জন জায়গায় কুপিয়ে হত্যা করে বীরদর্পে চলে যায়। এর আগে গত ৪ মে নগরীতে রাজু হাওলাদার (৩৮) নামে অপর আরেক গুলিবিদ্ধ যুবককে ঢাকায় নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্স লক্ষ্য করে আবারও গুলি করে সন্ত্রাসীরা। পরে খবর পেয়ে গুলিবিদ্ধ যুবকসহ পুলিশ অ্যাম্বুলেন্সটিকে ঐ এলাকা পার করে দেয়।

পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, গত পাঁচ মাসে খুলনা মহানগরীসহ জেলায় ২৯টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শুধু খুলনা মহানগরীতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১১টি। এছাড়া জেলার ৯ উপজেলায় ঘটেছে আরও ১৮টি।

সূত্র মতে, খুলনা মহানগরী ও মহানগরীসংলগ্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা, স্থানীয় প্রভাব বিস্তার, মাদক ব্যবসার প্রসার ও নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরেই খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) সূত্র জানায়, চলতি বছরের গত পাঁচ মাসে নগরীতে ১১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত জানুয়ারি মাসে খুলনা সদর থানায় সর্বোচ্চ তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এছাড়া গত বছর নগরীতে ট্রিপল হত্যাকাণ্ডসহ ৪০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। অপরদিকে, গত পাঁচ মাসে খুলনা জেলার ৯ উপজেলায় ১৮টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার বটিয়াঘাটা উপজেলার রাঙ্গেমারী এলাকার নির্জন জায়গায় কুপিয়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

এসব ব্যাপারে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ মাদক কারবারির তালিকা অনুযায়ী গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোসহ মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। এছাড়া চাঁদাবাজের তালিকায় রাজনৈতিক দলের ২৮ জন নেতাকর্মীর নাম উঠে এসেছে। অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অপরদিকে একটি গোয়েন্দা সংস্থার নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, নগরীতে ৪৭ জন সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের গডফাদারদের তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। এই গডফাদারদের তালিকায় রাজনৈতিক দলের কয়েক জন নেতা ও কথিত সাংবাদিকদের নাম রয়েছে। এদিকে র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, দেশ জুড়ে চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরির অংশ হিসেবে র‌্যাব-৬ খুলনা জেলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করেছে। প্রাথমিক তালিকায় স্থান পেয়েছে ৩৩ জন শীর্ষ অপরাধীর নাম। এর মধ্যে ১৫ জন শীর্ষ চাঁদাবাজ, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও অন্যান্য ১৮ জন। তবে এ তালিকা আরও বাড়তে পারে। ইতিমধ্যে তারা মাঠ পর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে।

র্যাব-৬ খুলনার অধিনায়ক লে. কর্নেল নিস্তার আহমেদ বলেন, প্রাথমিকভাবে চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকায় কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা থাকলে তাদেরও গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।

তিনি বলেন, নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত শনিবার শেষ রাতে নগরীতে অভিযান চালিয়ে মাদক সম্রাট রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন বি কোম্পানির চার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ পেলে মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও তাদের গডফাদারদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার অভিযান জোরদারভাবে শুরু করা হবে।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘খুলনায় অপরাধ দমনে দৃশ্যমান কোনো অভিযান আমরা দেখছি না। সন্ত্রাসী অপরাধীরা কোথায় অবস্থান করে, কাদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে থাকে তা প্রশাসনের জানা আছে। প্রশাসন চাইলেই যে কোনো সময় তাদের গ্রেপ্তার করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।

খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থার উন্নতি করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবিলম্বে মাদক কারবারি, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 9   +   7   =