সোহেল হাওলাদার
টাকার লোভ মানুষকে কতটা নিকৃষ্ট করতে পারে, তার এক জঘন্যতম দৃষ্টান্ত প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদার। পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার দিঘিরজান গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই পিকে হালদার। বাবা মৃত প্রণনেন্দু হালদার এবং মা লীলাবতী হালদার (যিনি পেশায় একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ছিলেন)। পিকে হালদার ও তাঁর ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার একসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক এবং পরবর্তীতে ব্যবসায় প্রশাসন (আইবিএ) থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। কিন্তু এই উচ্চশিক্ষা দেশের সেবায় নয়, ব্যবহৃত হয়েছে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ আর্থিক জালিয়াতির মাস্টারমাইন্ড হিসেবে।
যেভাবে ৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল ও ‘কাগুজে সাম্রাজ্য’ তৈরি
ব্যাংকিং সেক্টরে চাকরি শুরু করে পিকে হালদার দ্রুত নিজের এক শক্তিশালী প্রভাব বলয় তৈরি করেন। এরপর তিনি দেশের ৪টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: ১. ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ২. পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ৩. এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ৪. বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আজীবনের সঞ্চয় লুটের উদ্দেশ্যে পিকে হালদার নিজের নামের সাথে মিল রেখে এবং বেনামে একাধিক ভুয়া বা কাগুজে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল, পিঅ্যান্ডএল অ্যাগ্রো, পিঅ্যান্ডএল ভেঞ্চার, পিঅ্যান্ডএল বিজনেস এন্টারপ্রাইজ, হাল ইন্টারন্যাশনাল, হাল ট্রাভেল, হাল ট্রিপ, হাল ক্যাপিটাল এবং হাল টেকনোলজি। এছাড়া আনন কেমিক্যাল, নর্দান জুট, সুখাদা লিমিটেড ও রেপটাইলস ফার্মের মতো প্রতিষ্ঠানও এই তালিকায় ছিল। কাগজের কলমে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় রাখা হয় পিকে হালদারের মা লীলাবতী হালদার, ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার, ভাইয়ের স্ত্রী সুস্মিতা সাহা, খালাতো ভাই অমিতাভ অধিকারী ও অভিজিৎ অধিকারীসহ বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনকে। এই চক্রে যুক্ত ছিলেন ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এমডি ইরফানউদ্দিন আহমেদ এবং পিকে হালদারের সাবেক সহকর্মী উজ্জ্বল কুমার নন্দীও।
নেপথ্যের গডফাদার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা
সংসারের মাত্র কয়েকজন ব্যক্তির পক্ষে এত বড় জালিয়াতি সম্ভব হতো না, যদি না এর পেছনে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মদদ থাকত। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পুঁজিবাজারের কিছু অসাধু নিয়ন্ত্রকের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে এই লুণ্ঠন চালানো হয়। দুর্নীতি ও অর্থ চুরির সুবিধাভোগী হিসেবে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং তাঁর বাড়ি ও ব্যাংকের ভোল্ট থেকে কোটি কোটি অবৈধ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
ক্যাসিনো কাণ্ড ও দেশত্যাগ: যেভাবে ভাঙল সাম্রাজ্য
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঢাকা শহরে চাঞ্চল্যকর ‘ক্যাসিনো কাণ্ড’ নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পিকে হালদারসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। থলের বিড়াল বেরিয়ে আসার মুখে যখন তাঁর বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, ঠিক তার আগেই পিকে হালদার ও তাঁর পরিবার দেশের ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো প্রায় খালি করে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে ভারতে পালিয়ে যান। পাচারকৃত অর্থ দিয়ে ভারত ও কানাডায় একাধিক কোম্পানি খোলা হয়, যা বর্তমানে ভারতীয় ও কানাডিয়ান ব্যাংকে জমা রয়েছে।
বর্তমান অবস্থান ও আইনি জটিলতা
বাংলাদেশ সরকারের তথ্যের ভিত্তিতে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা ‘এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট’ (ইডি) পিকে হালদারকে গ্রেপ্তার করে। তিনি বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে অবস্থান করছেন। ভারতে তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে এবং বর্তমানে তিনি সেখানে জামিনে আছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে পিকে হালদারের বিরুদ্ধে মোট ৩৪টি দুর্নীতির মামলা রয়েছে, যার মধ্যে দুটি মামলায় ইতিমধ্যেই তাঁর ২২ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। কিন্তু ভারতের আদালতে মামলা চলমান থাকা এবং সেখানে জামিনে থাকার কারণে তাঁর শাস্তি কার্যকর করা এবং টাকা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না।
দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত
পিকে হালদার, এস আলম গ্রুপ এবং নাসা গ্রুপসহ বড় বড় অর্থলোভী চক্রের লাগামহীন চুরির ফলে দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে চরম ধস নেমেছে। অধিকাংশ আর্থিক প্রতিষ্ঠান আজ ফোকলা হয়ে পড়েছে। বেশ কয়েকটি ব্যাংক ইতিমধ্যেই দেউলিয়া হয়ে গেছে এবং কিছু দেউলিয়ার পথে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দেশের সাধারণ মানুষ বিপদের সময়ে নিজের গচ্ছিত টাকাও ব্যাংক থেকে তুলতে পারছেন না।
ভারতের ভূমিকা ও বন্দি বিনিময় চুক্তি
অর্থনৈতিক অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের জন্য পিকে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিকভাবে বারবার অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও ভারত সরকারের তরফ থেকে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ‘বন্দি বিনিময় চুক্তি’ থাকা সত্ত্বেও কেন এত বড় একজন অপরাধীকে হস্তান্তর করা হচ্ছে না, তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন উঠেছে। যেকোনো রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি হলো তার আর্থিক খাত— যা অর্থনীতির প্রাণ। এমন একজন ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক অপরাধীকে অন্য রাষ্ট্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলে তা আন্তর্জাতিক আইনে কতটুকু যৌক্তিক বা গ্রহণযোগ্য, সেই বড় প্রশ্ন ও দাবি রেখেই যায় বর্তমান পরিস্থিতি।
দৈনিক পূর্বাচল /অর্থনীতি ও অপরাধ/২০২৬

