অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে বিপন্ন বিশ্ব মানবতা

ডেস্ক রিপোর্ট, দৈনিক পূর্বাচল: অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়মিত এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার পুরো বিশ্বের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক নীরব মহামারি হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, যত্রতত্র অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের ফলে বিশ্বজুড়ে তৈরি হচ্ছে ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’ (AMR), যার কারণে সাধারণ জীবাণুগুলোও এখন ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। ফলস্বরূপ, একসময় যে সাধারণ সংক্রমণগুলো সহজেই নিরাময় হতো, সেগুলোই এখন হয়ে উঠছে মারাত্মক এবং প্রাণঘাতী। এই সংকট বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনকে এক চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

যেভাবে তৈরি হচ্ছে ‘সুপারবাগ’

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিকের ভুল এবং অপব্যবহারের কারণে ব্যাকটেরিয়ারা সময়ের সাথে সাথে নিজেদের জিনগত পরিবর্তন (Genetic Mutation) ঘটিয়ে ফেলে। এর ফলে তারা নির্দিষ্ট ওষুধের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। একপর্যায়ে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক আর ওই ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে পারে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই চরম প্রতিরোধী ও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করা জীবাণুগুলোকেই বলা হচ্ছে ‘সুপারবাগ’

ঝুঁকিতে সাধারণ চিকিৎসাসেবা

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে সামান্য কাটা-ছেঁড়া, নিউমোনিয়া, মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI) কিংবা যক্ষ্মা (TB)-এর মতো সাধারণ ও পরিচিত রোগগুলোর চিকিৎসা দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ছে।

যখন কোনো রোগীর শরীরে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না, তখন তাকে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। এতে একদিকে যেমন রোগীর ভোগান্তি বাড়ে, অন্যদিকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন (Higher-generation) ওষুধ ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে। এর ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে এবং জটিল অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করছে।

খাদ্যশৃঙ্খলে অ্যান্টিবায়োটিকের বিষাক্ত চক্র

কেবল মানুষের ওষুধেই নয়, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার চলছে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতেও। গবাদিপশু ও মাছের দ্রুত বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধের নামে খামারিরা ব্যাপক হারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছেন। অসচেতনতার কারণে এই ক্ষতিকর উপাদানগুলো পরবর্তীতে খাদ্যশৃঙ্খলের (Food Chain) মাধ্যমে সরাসরি মানবদেহে প্রবেশ করছে। ফলে কোনো ওষুধ না খেয়েও মানুষ অজান্তেই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের শিকার হচ্ছে।

২০৫০ সালের ভয়ঙ্কর পূর্বাভাস

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এক ভয়ঙ্কর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির মতে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের এই ধারা যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এই বিপুল প্রাণহানির পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক বিপর্যয়কর ধস নামার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষ সতর্কবার্তা: চিকিৎসকের পরামর্শ ও সুনির্দিষ্ট ডোজ ছাড়া যেকোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক সেবন থেকে বিরত থাকুন। আপনার সামান্য অসচেতনতা শুধু আপনার নিজের নয়, পুরো সমাজের জন্য ডেকে আনতে পারে চরম বিপর্যয়।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 0   +   1   =