সিলেট ব্যুরো:
সুদীর্ঘ ৭০০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম প্রকাশ্যে খোলা হলো সিলেটের ঐতিহাসিক হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের মানতের ডেগ ও দানবাক্স। আজ সোমবার (২২ জুন) জেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এসব দানবাক্স খুলে অর্থ গণনা করা হয়। গত ১৮ জুন সিলগালা করা তিনটি ডেগ এবং নতুন স্থাপিত দানবাক্স থেকে মাত্র ৫ দিনেই জমা হয়েছে নগদ ১৭ লাখ ৬৬ হাজার ৬৯ টাকা।
সিলেট জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আজ জোহরের নামাজ শেষে বেলা ২টার দিকে সিলগালা করা ডেগ ও দানবাক্সগুলো খোলা হয়। সবার সামনে সেখান থেকে বস্তাভর্তি টাকা বের করে গণনার জন্য নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
তদারকিতে ছিলেন সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ডিসি
আজকের এই পুরো অর্থ গণনা কার্যক্রমটির তদারকিতে ছিলেন ‘মাজারকাণ্ডের’ জেরে সদ্য প্রত্যাহার হওয়া সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম। গতকাল রবিবার (২১ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে তাকে সিলেট থেকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়।
উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে আলোচিত ‘পাথরকাণ্ডের’ পর সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন মো. সারওয়ার আলম। এই ১০ মাসের কার্যকালে প্রশাসনিক কোনো বিতর্কে না জড়ালেও, অতি সম্প্রতি শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.) মাজারের দান ব্যবস্থাপনা সংস্কার করতে গিয়ে তিনি ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেন।
বিতর্ক ও মাজারকাণ্ডের পটভূমি
সিলেটের এই দুটি ঐতিহাসিক মাজারে প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী আসেন। তারা নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কারসহ বিভিন্ন সামগ্রী দান করেন। দীর্ঘদিন ধরে এই দানের হিসাব, ব্যয় ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা প্রশ্ন উঠলেও তা কখনো প্রশাসনিক নজরদারির আওতায় আসেনি।
গত ১২ জুন সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ডিসি সারওয়ার আলম শাহজালাল (রহ.) মাজার পরিদর্শনে গিয়ে দান ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের ঘোষণা দেন। এর কয়েকদিন পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজারে মানতের টাকা সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত তিনটি ঐতিহ্যবাহী ডেগ সিলগালা করে দেওয়া হয় এবং নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। সে সময় নিরাপত্তায় আনসার সদস্যও মোতায়েন করা হয়েছিল।
খাদেমদের বিরোধিতা ও ডিসি প্রত্যাহার
প্রশাসনের এই সংস্কার উদ্যোগের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই প্রকাশ্যে অবস্থান নেয় মাজারের খাদেমদের একটি পক্ষ। দান ব্যবস্থাপনায় সরকারি হস্তক্ষেপের সমালোচনা করে তারা প্রচলিত নিয়মের পক্ষেই সাফাই গান। খাদেমদের এই তীব্র বিরোধিতার মধ্যেই গতকাল আকস্মিকভাবে ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়। সরকারি প্রজ্ঞাপনে প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা না হলেও, সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন এই ‘মাজারকাণ্ডের’ জের ধরেই তাকে বদলি করা হয়েছে।
আজ বিদায়ের প্রাক্কালে মাজারের অর্থ গণনা শেষে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম মন্তব্য করেন, “কিছু উদ্যোগ শেষ করা গেল না।” তবে প্রশাসনের এই পদক্ষেপের পর মাজারের দান ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ কোন দিকে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

