ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আরও ৪৫ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে এসএমই ফাউন্ডেশন

৩টি ব্যাংকের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর * ৭ থেকে ৯ শতাংশ সুদে মিলবে তহবিল * ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লাগবে না কোনো জামানত

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, দৈনিক পূর্বাচল:

দেশের অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদেশফেরত প্রবাসীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনের নিজস্ব ‘রিভলভিং তহবিল’ থেকে দেশের ক্ষুদ্র, কটেজ ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তাদের মাঝে আরও ৪৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করা হবে। এই কর্মসূচির আওতায় একজন উদ্যোক্তা যোগ্যতা ও খাতভেদে সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবেন।

এই ঋণ কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের ৩টি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। ১৬ জুন (মঙ্গলবার) রাতে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে অংশীদার ৩টি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীগণ নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক এবং কর্মসংস্থান ব্যাংক।

সুদের হার ও ঋণের সীমা:

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, খাত এবং উদ্যোক্তাদের ধরন অনুযায়ী ঋণের সুদের হার ও সীমার মধ্যে কিছু বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। অর্থ বিভাগের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির আওতায় সাধারণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা মাত্র ৮ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বাংলাদেশের সহায়তায় এবং কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশফেরত প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার সুদের হার হবে মাত্র ৭ শতাংশ। এই খাতে সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হবে। তবে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের উদ্যোক্তারা ৯ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত বড় অঙ্কের ঋণ সুবিধা পাবেন।

১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লাগবে না জামানত:

ক্ষুদ্র ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় স্বস্তির খবর হলো, এই ঋণের জন্য অংশীদার ব্যাংকগুলোকে ‘জামানতবিহীন’ ঋণ বিতরণের বিষয়ে উৎসাহিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহককে কোনো ধরনের জামানত দিতে হবে না। গ্রাহক পর্যায়ে এই ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ বছর (৪৮টি মাসিক কিস্তি)। তবে ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণগ্রহীতারা শুরুতে ৬ মাসের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ (কিস্তি অব্যাহতি কাল) সুবিধা পাবেন।

অগ্রাধিকার পাবেন নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী:

এসএমই ফাউন্ডেশন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত ও কোটা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর মধ্যে মোট ঋণের ন্যূনতম ২৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের মাঝে এবং ২০ শতাংশ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নির্দিষ্ট এসএমই ক্লাস্টারের উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ করা বাধ্যতামূলক। এছাড়া, মোট তহবিলের অন্তত ৩০ শতাংশ বিতরণ করতে হবে ১০ লক্ষ টাকা বা তার কম অঙ্কের ঋণের আকারে। তহবিলের ন্যূনতম ৬০ শতাংশ উৎপাদনশীল খাতে এবং সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ভ্যালু চেইন (ফরওয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ) খাতে দেওয়া যাবে।

কাদের দেওয়া হবে এই ঋণ?

অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এসএমই সাব-সেক্টরের উদ্যোক্তা, রপ্তানি ও আমদানি-বিকল্প পণ্যের উৎপাদক, আইসিটি ও প্রযুক্তিনির্ভর নতুন তরুণ উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা, পশ্চাদপদ ও উপজাতীয় অঞ্চলের ব্যবসায়ী, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের উদ্যোক্তা, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের সবুজ প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ এবং উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী বিদেশফেরত প্রবাসীরা এই ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।

কড়া নজরদারি, মুদি দোকান ঋণ পাবে না:

ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে এসএমই ফাউন্ডেশন। ঋণ প্রদানের পর ফাউন্ডেশনের নিজস্ব লোকবল দিয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করে যাচাই করা হবে যে, প্রকৃত উদ্যোক্তা সঠিক নিয়মে টাকা পেয়েছেন কি না। একই সাথে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনো অনুৎপাদনশীল খাত— যেমন মুদি দোকান, ওষুধের দোকান, হার্ডওয়্যার ব্যবসা কিংবা পরিবেশ দূর্ষণকারী কোনো শিল্প এই কর্মসূচির আওতায় কোনো ঋণ পাবে না।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের টেকসই ভিত্তি:

অনুষ্ঠানে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, “আজ আমরা এমন এক উদ্যোগের সূচনা করছি, যার মাধ্যমে রেমিট্যান্সকে উদ্যোক্তায়, উদ্যোক্তাকে বিনিয়োগে এবং বিনিয়োগকে কর্মসংস্থানে রূপান্তরের একটি টেকসই ভিত্তি নির্মাণ করা হবে। শিল্প মন্ত্রণালয় এসএমই ফাউন্ডেশনকে আরও শক্তিশালী, আধুনিক এবং গতিশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

শিল্পসচিব আব্দুন নাসের খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ, আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টিউনন, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান, বিসিক চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নূরুন নাহার। স্বাগত বক্তব্য দেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী এবং ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজিম হাসান সাত্তার।

উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির আওতায় দেশের প্রায় ১৩ হাজার সিএমএসএমই উদ্যোক্তার মাঝে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ বিতরণ করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 5   +   5   =