মেধার বদলে টাকার খেলা: সরকারি চাকরিতে ‘প্রক্সি সিন্ডিকেট’ নিয়ন্ত্রণ করছে খোদ সরকারি কর্মকর্তারাই!

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তারিখ: ১৭ জুন, ২০২৬

সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের পরীক্ষায় প্রক্সি সরবরাহকারী এক ভয়ংকর সিন্ডিকেটের সন্ধান। নেপথ্যে খোদ কাস্টমস ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মচারীরা। বিস্তারিত পড়ুন দৈনিক পূর্বাচলের বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।

বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক পূর্বাচল:

পরীক্ষার হলে ঢুকছেন একজন। হাতে প্রবেশপত্র, মুখে আত্মবিশ্বাসের স্পষ্ট ছাপ। কিন্তু তিনি যে প্রকৃত পরীক্ষার্থী নন, সেটা জানেন কেবল তিনি নিজে আর যিনি তাকে টাকার বিনিময়ে পাঠিয়েছেন। আসল পরীক্ষার্থী তখন হয়তো বাড়িতে বসে সরকারি চাকরিটা নিশ্চিত করার আর্থিক হিসাব কষছেন। অথচ একই সময়ে দেশের লক্ষাধিক তরুণ-তরুণী বছরের পর বছর রাত জেগে প্রস্তুতি নিচ্ছেন সেই একটি পদের জন্য, যা ইতোমধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে মোটা অঙ্কের টাকায়।

মেধার সঙ্গে নয়, প্রতিযোগিতা হচ্ছে টাকার সঙ্গে। দেশের সরকারি নিয়োগব্যবস্থায় এখন এই দুই সমান্তরাল ও নজিরবিহীন বাস্তবতা পাশাপাশি চলছে।

সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা-২০২৫ ঘিরে কক্সবাজার জেলায় সংঘটিত এক নজিরবিহীন জালিয়াতির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমনই এক ভয়ংকর সিন্ডিকেটের তথ্য। যারা দীর্ঘদিন ধরে অর্থের বিনিময়ে ‘প্রক্সি পরীক্ষার্থী’ বা ‘শুটার’ সরবরাহ করে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার এক রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে আসছে।

শর্ষের মধ্যেই ভূত: নেপথ্যে সরকারি চাকরিজীবীরাই

এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এই চক্রটির মূল কারিগরদের মধ্যে রয়েছেন স্বয়ং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরাই। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত, তাদেরই কেউ কেউ হয়ে উঠেছেন নিয়োগব্যবস্থা ধ্বংসের মূল কারিগর। এ যেন শর্ষের মধ্যেই ভূত।

প্রাপ্ত তথ্য, নথিপত্র, পরীক্ষার রেকর্ড এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়া গ্রামের আমান উল্লাহ নাহিনের (রোল: ৪৬২১০৬৫) হয়ে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার লিখিত অংশে অংশ নেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কর্মরত সিপাহী মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম।

চকরিয়া উপজেলার কোরালখালী সাহারবিল এলাকার বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম কোনো সাধারণ প্রক্সি পরীক্ষার্থী নন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের হয়ে বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে আসছেন। কাস্টমসের মতো একটি স্পর্শকাতর সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে তিনি কীভাবে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক পরীক্ষায় প্রক্সি দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, তা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।

এমনকি চলতি বছরের ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের যানবাহন শাখার পরিদর্শক পদে নিয়োগ পরীক্ষাতেও অন্য এক প্রার্থীর হয়ে লিখিত পরীক্ষায় প্রক্সি দিয়েছিলেন এই আজিজুল।

মূল সমন্বয়ক ও টার্গেট সেক্টর

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই পুরো নেটওয়ার্কটির অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন কুতুবদিয়া উপজেলার বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ডিপিএইচই) মেকানিক পদে কর্মরত আছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরপরই মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠে এই সিন্ডিকেট। তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে ১৬তম থেকে ১৮তম গ্রেডের সরকারি চাকরির পদগুলো। বিশেষ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, ডাক বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (ডিএসএইচই) এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে এদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি থাকে।

যেভাবে চলে এই ‘সেলভিত্তিক’ অপরাধ নেটওয়ার্ক

চক্রটির কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও ধাপে ধাপে পরিচালিত হয়। ১. প্রার্থী সংগ্রহ ও চুক্তি: প্রথমে চাকরিপ্রত্যাশী সংগ্রহ করে তাদের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা হয়। চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে প্রার্থীর কাছ থেকে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা, ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি অঙ্কের গোপন চুক্তি করা হয়। ২. মেধা ভাড়া করা: চুক্তি সম্পাদন শেষে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত মেধাবী সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের ‘প্রক্সি শুটার’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এদের অনেকেই বিসিএস বা ব্যাংক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া উচ্চ মেধারী। তাদের মেধাকে টাকার জোরে ভাড়া করে মূল পরীক্ষার্থীর পরিবর্তে বসানো হয়। ৩. সেলভিত্তিক কাঠামো: চক্রের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে কাজ করেন। কেউ পরীক্ষার্থী ধরেন, কেউ আর্থিক লেনদেন সামলান, কেউ প্রক্সি শুটার ঠিক করেন। এই ছদ্মবেশী কাঠামোর কারণে একজন সদস্য ধরা পড়লেও পুরো নেটওয়ার্কের তথ্য সহজে বের করা যায় না।

আঙুল ফুলে কলাগাছ: কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা

অনুসন্ধানে এই চক্রের সঙ্গে জড়িতদের অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির তথ্য মিলেছে। সরকারি চাকরির সীমিত আয়ের সঙ্গে এদের দৃশ্যমান বিলাসবহুল জীবনযাত্রা, জমি ক্রয়, বহুতল বাড়ি নির্মাণ ও ব্যাংক লেনদেনের কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না স্থানীয়রা। কয়েক বছর আগেও যাদের আর্থিক অবস্থা সাধারণ ছিল, তারা এখন কোটি কোটি টাকার মালিক।

আইনি ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মাহমুদ ইসলাম সুমন ‘দৈনিক পূর্বাচল’-কে বলেন,

“এই অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু পরীক্ষা জালিয়াতি নয়; বরং প্রতারণা, পরিচয় গোপন, জালিয়াত চক্র গঠন, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থা ধ্বংস করার মতো গুরুতর অপরাধ। এদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে নিয়োগব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মেকানিক মো. আনোয়ার হোসেন আকুতি জানিয়ে বলেন, “গুরু, আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে মাফ করে দেন। এসব কাজ এখন আমি আর করি না। আপনার নিউজের কারণে মান-সম্মান যা ছিল, তা চলে গেছে। এখন বাকি জীবন আল্লাহ আল্লাহ করে কাটাতে চাই।”

অন্যদিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সিপাহী মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম নিজের দায় এড়াতে বলেন, “আমাকে ধরে লাভ কী? আমি অল্প টাকা পাই, ছোট মানুষ। আপনি বড় ভাই আনোয়ারের সঙ্গে কথা বলেন। রাঘববোয়ালদের ধরেন।” তবে পর্দার আড়ালের সেই ‘রাঘববোয়াল’ কারা, সে বিষয়ে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট মুখ খোলেননি।

মেধাবীদের স্বপ্ন চুরি করা এই চক্রের পেছনের মূল গডফাদারদের মুখোশ উন্মোচনে এখন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের কঠোর পদক্ষেপ সময়ের দাবি।

নিয়োগ পরীক্ষা জালিয়াতি, প্রক্সি পরীক্ষার্থী, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫, , Dainik Purbachal.

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 3   +   6   =