তারিখ: ১৭ জুন, ২০২৬
চট্টগ্রাম ব্যুরো, দৈনিক পূর্বাচল:
চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক মাসুদ হত্যাকাণ্ডের নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য। র্যাব-৭ এর সাথে চা পানের পরপরই হামলা। নেপথ্যে বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ ও সাজ্জাদ বাহিনীর সম্পৃক্ততা। বিস্তারিত পড়ুন দৈনিক পূর্বাচলে।
চট্টগ্রামের রাউজানের পাহাড়তলী এলাকায় যুবদল নেতা মাসুদুল হক মাসুদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নতুন নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। স্থানীয় একাধিক সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গুলিতে নিহত হওয়ার মাত্র কিছুক্ষণ আগে একটি রেস্টুরেন্টে র্যাব-৭-এর সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন মাসুদ। র্যাবের গাড়ি ওই এলাকা ত্যাগ করার পরপরই আগে থেকে ওত পেতে থাকা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পর মঙ্গলবার নিহত মাসুদের বড় ভাই পেয়ারুল হক চৌধুরী বাদী হয়ে রাউজান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় মোহাম্মদ রায়হান, মোহাম্মদ ইলিয়াস, মোহাম্মদ মোবারক, দিদারুল আলম ও মোহাম্মদ ইউসুফসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) বেলায়েত হোসেন। ইতিমধ্যে এজাহারভুক্ত এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে র্যাব।
র্যাবের সাথে দেখা হওয়া কি ‘কাকতালীয়’?
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার হত্যাকাণ্ডের আগে পাহাড়তলীর ‘কার্বন রেস্টুরেন্ট’-এ সিভিল পোশাকে থাকা র্যাব-৭ এর কয়েকজন সদস্যের সাথে নাস্তা ও চা পান করেন মাসুদ। রাউজানের একাধিক সূত্র দাবি করছে, মাসুদ র্যাবের তথ্যদাতা (সোর্স) হিসেবে কাজ করতেন। বৈঠক শেষে র্যাব সদস্যরা গাড়ি নিয়ে রাঙ্গুনিয়ার দিকে চলে যাওয়ার পরপরই মাসুদ হেঁটে পাহাড়তলী মোড়ে পৌঁছালে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আসা অস্ত্রধারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
তবে মাসুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ‘কাকতালীয়’ বলে দাবি করেছে র্যাব। র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, “আমাদের একটি দল রাঙ্গুনিয়ায় অভিযানে যাচ্ছিল। পথে মাসুদের সঙ্গে দেখা হলে তারা একসঙ্গে চা পান করেন। তিনি এলাকার একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, তার সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপ হয়েছে। তবে তিনি র্যাবের সোর্স ছিলেন—এমন দাবি সঠিক নয়।” তিনি আরও জানান, র্যাবের টহল দল এলাকা ত্যাগ করার পরই ঘটনাটি ঘটে এবং র্যাব ইতিমধ্যে একজনকে গ্রেফতার করেছে।
নেপথ্যে বালুমহাল ও সাজ্জাদ বাহিনীর বিরোধ
তদন্তকারী কর্মকর্তা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ধারণা, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যার নেপথ্যে রয়েছে রাউজান-রাঙ্গুনিয়ার কোটি টাকার বালু ব্যবসা ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাহাড়তলীর এক ব্যবসায়ী জানান, রাউজানের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী ফজলুল হক ওরফে ফজল হক ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এলাকার বালুর ব্যবসা, মাটি কাটা ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন। নিহত মাসুদও বালুর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। প্রায় এক মাস আগে বিরোধের জেরে ফজল হকের দুটি ড্রেজার ডুবিয়ে দিয়েছিলেন মাসুদ। পাল্টা জবাবে ফজল গ্রুপ মাসুদের একটি এক্সকাভেটরে (মাটি কাটার যন্ত্র) আগুন দেয়। এই ব্যবসায়িক বিরোধ থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মাসুদ বেতাগী বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করতেন। রাউজান-রাঙ্গুনিয়া বালুমহাল থেকে প্রতি মাসে বিশাল অংকের চাঁদা তোলেন বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’। সিসিটিভি ফুটেজে সাজ্জাদ বাহিনীর অস্ত্রধারীদেরই সরাসরি গুলি চালাতে দেখা গেছে। মাসুদের সঙ্গে সাজ্জাদ গ্রুপের এই চাঁদা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অপরাধ করে কেউ পার পাবে না: পুলিশ সুপার
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, “ঘটনার দিন থেকেই আমরা পাহাড়ি এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করছি। আমরা স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই—অপরাধ করে কেউ পার পেয়ে যাবে না।
‘র্যাব-৭’, ‘সাজ্জাদ বাহিনী’, ‘বেতাগী বালুমহাল’ এবং ‘মাসুদুল হক মাসুদ’

