গরু চোর থেকে শিশু হত্যাকারী: সামনে এলো যুবলীগ কর্মী সোহেল রানার অন্ধকার অতীত

নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক পূর্বাচল

ঢাকা: রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তারকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার মূল হোতা জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা (৩৪)। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর রাজধানীসহ দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও, রানার নিজের জন্মভূমি নাটোরে যেন স্বস্তির নিশ্বাস নেমেছে। তবে একই সঙ্গে তার এমন পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে চরম লজ্জিত ও ক্ষুব্ধ তার পরিবার এবং এলাকাবাসী। রানা  যুবলীগ কর্মী , তার অতীত ঘেঁটে জানা গেছে মাদক, চুরি, জুয়া আর পরকীয়ার এক অন্ধকার অধ্যায়।

শুক্রবার (২২ মে) নাটোরের সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের মহেষচন্দ্রপুর গ্রামে  ঘাতক সোহেল রানার পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে তার অতীত জীবনের নানা অপকর্মের তথ্য।

পড়াশোনায় ইস্তফা, রাজনীতিকে ঢাল বানিয়ে ত্রাসের রাজত্ব

স্থানীয় প্রতিবেশী ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর মহিদুল ইসলাম জানান, ছোটবেলায় সবাই তাকে রানা নামে ডাকত। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর লেখাপড়ায় তার আর মন বসেনি। তরুণ বয়সে এসে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে স্থানীয় আওয়ামী যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সে। পরিচিতি ও প্রভাব বাড়াতে স্থানীয় বাজারে যুবলীগ কর্মী পরিচয়ে বড় বিলবোর্ডও টানায়।

কলম ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য জনাব আলী বলেন, “সোহেল রানা ছোটবেলা থেকেই এলাকায় মাদক এবং অনলাইন জুয়ায় চরমভাবে আসক্ত ছিল। পরে স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক মেম্বার রফিকুল ইসলাম এবং ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি রাকিব মণ্ডলের ‘ডান হাত’ হিসেবে এলাকায় নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে সে। বেশ কয়েক বছর যুবলীগের পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল।”

সেতুর রড ও গরু চুরি করে জেল খাটেন রানা

এলাকাবাসী জানায়, রানার অপরাধের মাত্রা এতটাই বেড়েছিল যে সে রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। আত্রাই নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি সেতুর নির্মাণ সামগ্রী ও রড চুরির ঘটনায় হাতেনাতে ধরা পড়ে মামলার আসামি হয় এবং জেলও খাটে। এছাড়া এলাকায় গরু চুরির সিন্ডিকেটের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। তবে তার রাজনৈতিক ছাতা হিসেবে পরিচিত সাবেক ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, “রানা আমার কোনো ডান হাত ছিল না। এলাকার ছেলে হিসেবে ওঠাবসা করত মাত্র।” অবশ্য তিনিও রানার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন।

পরকীয়া ও জুয়া: পরিবার ধ্বংস করে এলাকাছাড়া

মহেষচন্দ্রপুর বাজারে রানার চাচা রেজাউল করিমের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ঢাকায় আসার আগে এই বাজারেই রানা সাইকেল মেকানিকের কাজ করত। এর মধ্যে পাশের গ্রামে প্রথম বিয়ে করে সে। সেখানে একটি ছেলেসন্তান হওয়ার পর ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে রানা। এই নৈতিক স্খলনের জেরে ১০ বছরের প্রথম সংসারটি ভেঙে যায়। ৪ বছর আগে বালুয়া বাসুয়া গ্রামের এক তরুণীকে দ্বিতীয় বিয়ে করে সে ঢাকায় চলে আসে। এরপর থেকে গ্রামের বাড়ির সঙ্গে তার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। ঢাকায় এসে সে রিকশা মেকানিকের কাজ শুরু করলেও তার অপরাধপ্রবণতা কমেনি।

‘কুলাঙ্গার’ ছেলের সর্বোচ্চ শাস্তি চান বাবা-মা

সোহেল রানার পৈশাচিক কাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছে তার নিজের পরিবার। রানার বাবা জেকের আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “মদ, জুয়া আর অপকর্মের কারণে মানুষের কাছে মোটা অঙ্কের দেনা করে সে এলাকা ছাড়ে। সেই দেনা শোধ করতে গিয়ে আমি আজ নিঃস্ব। গত চার বছর ধরে ঈদেও সে বাড়ি আসেনি, আমাদের খোঁজ নেয়নি। এমন ছেলের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া দরকার।”

মা খাদিজা বেগম ক্ষোভ ও লজ্জায় বলেন, “এমন কুলাঙ্গার ছেলের প্রতি আমার আর কোনো ভালোবাসা বা দয়া নেই। সে যে জঘন্য কাজ করেছে, তার কঠিন বিচার চাই। এই দাবি শুধু আমার একার নয়, পুরো দেশবাসীর।”

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার (১৯ মে) পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর বাথরুমের গ্রিল কেটে পালিয়ে গেলেও র‍্যাব ও পুলিশের তৎপরতায় নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেফতার হয় সোহেল রানা। ইতিমধ্যেই সে আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। ঢাকা আইনজীবী সমিতিও ঘাতক সোহেল রানার পক্ষে কোনো আইনি লড়াই না লড়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 3   +   10   =