সামাজিকভাবে আমরা কোথায় যাচ্ছি: একের পর এক নৃশংসতা

বিশেষ প্রতিবেদন |সোহেল হাওলাদার (নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল)

 সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে একের পর এক লোমহর্ষক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে চলেছে, যা কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিকেই নির্দেশ করে না, বরং আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর গভীর ক্ষতকেও প্রকাশ্যে এনেছে। গাজীপুরের কাপাসিয়া, রাজধানীর পল্লবী ও মুগদা-মান্ডার সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনা পুরো দেশবাসীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। প্রতিটি ঘটনার ধরনে যে চরম নৃশংসতা ও নির্মমতা দেখা গেছে, তা সুস্থ ও স্বাভাবিক নাগরিক সমাজের ভাবনার অতীত।

কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচজনকে হত্যা: সম্পর্কের চরম বিপর্যয়

গত ৯ মে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় নিজের ঘরেই নৃশংসভাবে খুন হন একই পরিবারের পাঁচজন—তিন শিশু সন্তান মীম (১৫), মারিয়া (৮), ফারিহা (২), স্ত্রী শারমিন এবং শ্যালক রসুল। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত খোদ পরিবারের কর্তা ও বাবা ফোরকান মিয়া, যার লাশ পরে নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। যে বাবা সন্তানদের পরম আশ্রয়ের জায়গা, সেই বাবার হাতেই সন্তানদের এমন নির্মম পরিণতি কেন? কীসের ক্ষোভে বা মানসিক বিকৃতি থেকে একজন মানুষ নিজের সন্তানদের জবাই করতে পারে—সেই প্রশ্ন এখন তাড়া করে ফিরছে समाजविज्ञानীদের।

পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যা: বিচারব্যবস্থার ওপর এক বাবার আক্ষেপ

রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যার ঘটনাটি মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের আরেকটি প্রমাণ। ঘাতক সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে পুলিশ ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে এবং ঘাতক আদালতে দোষ স্বীকারও করেছে। তবে এই ঘটনার পর নিহত শিশুর বাবা আবদুল হান্নান মোল্লার একটি আক্ষেপ দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর অনাস্থাকেই স্পষ্ট করে তোলে। তিনি ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই।” অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াই যে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ, এই বাবার বক্তব্য যেন তারই প্রতিফলন।

মুগদা-মান্ডায় টুকরো টুকরো লাশ ও খুনিদের বিকৃত উল্লাস

তার ঠিক এক দিন আগে, ১৭ মে মুগদা-মান্ডায় প্রবাসী মোকাররম মিয়ার (৩৭) আট টুকরো লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি অপরাধের এক নতুন ও ভয়াবহ রূপকে সামনে এনেছে। পরকীয়া প্রেমিকা তাসলিমা, তার বান্ধবী হেলেনা এবং এক কিশোরী মিলে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। আরও শঙ্কার বিষয় হলো, হত্যার পর লাশ গুম করে খুনিরা স্বাভাবিকভাবে বিরিয়ানি খেয়েছে এবং প্রতিবেশীদের নিয়ে ছাদে পার্টি করেছে। খুনের পর এমন উদাসীনতা ও উল্লাস কোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিসংখ্যান কী বলছে?

পুলিশ সদর দপ্তরের সংগৃহীত পরিসংখ্যান সমাজের এই ভয়াবহ চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে:

  • জানুয়ারি-এপ্রিল (চলতি বছর): সারা দেশে মোট ১,১৪২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

  • দৈনিক গড়: প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টির মতো খুনের ঘটনা ঘটছে।

  • এপ্রিল মাস: একক মাস হিসেবে এপ্রিলে ২৮৭টি খুন হয়েছে।

  • রাজধানীর চিত্র: গত চার মাসে শুধু ঢাকা শহরেই ৭৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

ডা. মেখলা সরকার (মনোরোগ বিশেষজ্ঞ): “বিশ্বব্যাপী একটি অস্থিরতা চলছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার। মানুষ তার আত্মিক ও পারিবারিক বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অতিরিক্ত লোভ, স্বজনদের প্রতি সহমর্মিতার অভাব, এবং প্রযুক্তি আসক্তি (যেমন ক্রাইম প্যাট্রল বা নেটফ্লিক্সে ভয়ংকর অপরাধমূলক কনটেন্ট দেখা, ছোটবেলা থেকেই গেমসের মাধ্যমে খুনোখুনি শেখা) মানুষের সংবেদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সমাজে সংস্কৃতিচর্চা, খেলাধুলার সুযোগ এবং ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি জোর দিতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার सीमित করা জরুরি।”

খোন্দকার রফিকুল ইসলাম (অতিরিক্ত আইজিপি, ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস, police সদর দপ্তর): “সামাজিকভাবে মানুষ খুব অল্পতেই ধৈর্যহারা হয়ে যাচ্ছে। নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া এবং অবৈধ সম্পর্কের কারণে এসব অপরাধ বাড়ছে। এ ধরনের পারিবারিক বা ব্যক্তিগত অপরাধ আগে থেকে প্রতিরোধ করা কঠিন হলেও, পুলিশ প্রতিটি ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং কেউ অপরাধে জড়ালে ছাড় দেওয়া হবে না।”

দৈনিক পূর্বাচলের সম্পাদকীয় পর্যবেক্ষণ:

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক ও পারিবারিক জাগরণ। কেবল অপরাধের পর বিচার বা গ্রেফতারই সমাধান নয়; বরং অপরাধের উৎস—অর্থাৎ নৈতিক অবক্ষয়, সাংস্কৃতিক শূন্যতা এবং পারিবারিক দূরত্বের মতো বিষয়গুলো নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুন করে ভাবতে হবে। সুস্থ বিনোদন, পারিবারিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তরুণ প্রজন্মকে সুস্থ ধারার মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের সুযোগ না দিলে এই ধরনের নৃশংসতা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 0   +   2   =