১/১১, ডিপ স্টেট, গণতন্ত্রের বিপদ

‘ডিপ স্টেট’দৈনিক পূর্বাচল ডেস্ক। রবিবার ২৯ মার্চ
‘ডিপ স্টেট
‘গভীর রাষ্ট্র’—শব্দটি ইদানীং বাংলাদেশের রাজনীতিক পরিসরে বেশ জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। নামটা রহস্যময় হলেও অর্থটি বেশ গভীর। সহজ কথায় বলতে গেলে, এটি কোনো নির্বাচিত বা দৃশ্যমান সরকার নয়। পর্দার আড়ালে থাকা এক শক্তিশালী ও অঘোষিত সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা।
অনেকেই ভাবেন এটি আসলে কী? কেন এটি নিয়ে এত আতঙ্ক আর সন্দেহ ছড়িয়ে পড়ছে? মূলত, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১/১১-এর সেই বিতর্কিত অধ্যায়টি যখন নতুন করে আলোচনায় আসছে, তখন অনেকেই এর সাথে ‘ডিপ স্টেট’-এর একটি নিবিড় যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন।
১/১১-এর সেই সময়ে একটি দৃশ্যমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আড়ালে অদৃশ্য কিছু শক্তি রাষ্ট্রের কলকাঠি নেড়েছিল। তখনকার গোয়েন্দা সংস্থা, প্রভাবশালী আমলাতন্ত্র, কতিপয় রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী এবং উচ্চাভিলাষী মহলের গোপন আঁতাতকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ‘ডিপ স্টেট’ বলে অভিহিত করেন, যা গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় বিপদ। যখন জনগণের ভোটের চেয়ে পর্দার আড়ালের সমঝোতা বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখনই গণতন্ত্র পথ হারায়, ডিপ স্টেট শক্তিশালী হয়।
কিন্তু গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য হলো ভয়ের সংস্কৃতি ও অদৃশ্য ক্ষমতার বলয় থেকে মুক্তি পাওয়া। ফলে ১/১১ এবং ডিপ স্টেটকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কেবল এই সংকটের ব্যবচ্ছেদই করছেন না। তারা খুঁজছেন উত্তরণের টেকসই পথ। তারা চান এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতা কোনো গোপন কুঠুরিতে নয়, বরং জনগণের হাতেই ন্যস্ত থাকবে। এবং ক্ষমতা দখলের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য খেলা চিরতরে বন্ধ হবে।
১/১১: একটি পরিকল্পিত ‘সফট ক্যু’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১/১১ কেবল একটি সাধারণ ক্ষমতা বদলের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল গণতন্ত্রের পিঠে এক পরিকল্পিত ছুরিকাঘাত। একে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সফট ক্যু’ (Soft Coup)। সরাসরি সামরিক শাসন জারি না করে একটি বেসামরিক ‘তত্ত্বাবধায়ক’ সরকারের আড়ালে প্রকৃত ক্ষমতাকে কুক্ষিগত রাখা হয়েছিল তখন।
১/১১-এর মূল লক্ষ্য ছিল বিরাজনীতিকরণ। ‘মাইনাস-টু ফর্মুলা’র মাধ্যমে প্রধান দুই নেত্রীকে সরিয়ে দিয়ে রাজনীতিতে এক কৃত্রিম শূন্যতা তৈরির চেষ্টা করা হয়। একইসঙ্গে দুর্নীতির দোহাই দিয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে রাজনীতিবিদদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। আর এই পুরো প্রক্রিয়াকে নৈতিক বৈধতা দিতে সাহায্য করেছিল রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, মিডিয়া ও সুশীল সমাজের একটি সুবিধাভোগী অংশ।
ডিপ স্টেট: পর্দার আড়ালের সমান্তরাল শাসন
অন্যদিকে, ‘ডিপ স্টেট’ বা গভীর রাষ্ট্র হলো নির্বাচিত সরকারের ভেতরে বা উপরে থাকা এমন এক অদৃশ্য শক্তি, যারা জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই দেশ চালায়। তুরস্কের ‘দেরিন দেভলেত’ ধারণা থেকে আসা এই পদ্ধতিতে সামরিক কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রভাবশালী আমলা, ভ্রষ্ট রাজনীতিবিদ ও অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি হয়।
বাংলাদেশে ১/১১-এর সময় এই রূপটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তৎকালীন ফখরুদ্দীন সরকার ছিল কেবল একটি দৃশ্যমান ‘মুখোশ’, কিন্তু ক্ষমতার আসল কলকাঠি ছিল পর্দার আড়ালে থাকা কিছু গোয়েন্দা সংস্থা ও সেনা-বেসামরিক কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ীদের হাতে। দুঃখজনক বিষয় হলো, ১/১১-এর পর এই কাঠামোর বিলুপ্তি ঘটেনি; বরং পরবর্তী সময়ে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ ও বিরোধী দল দমনে এই অদৃশ্য শক্তি বারবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
তারা কীভাবে রাষ্ট্রকে জিম্মি করে?
ডিপ স্টেট মূলত চারটি কৌশলে তাদের আধিপত্য বজায় রাখে:
ক) আমলাতান্ত্রিক প্রভাব: সরকার পরিবর্তন হলেও আমলারা নিজেদের প্রভাব বজায় রাখে এবং নির্বাচিত সরকারের কাজে অসহযোগিতা করে।
খ) গোয়েন্দা নজরদারি: ব্ল্যাকমেইল ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার করে রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
গ) গোপন সমঝোতা: নিয়মতান্ত্রিক পথ এড়িয়ে পর্দার আড়ালে বড় বড় অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পাদন করা।
ঘ) আইনি ঢাল: আদালতের মাধ্যমে নিজেদের অসাংবিধানিক কাজগুলোকে বৈধ করে নেওয়া।
বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার ও বিএনপি
১/১১-এর বিচার কোনো প্রতিহিংসার বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক শুদ্ধি। যদি এই অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখলের বিচার না হয়, তবে ভবিষ্যতে আবারও এমন দুঃসাহস দেখানোর পথ খোলা থাকবে। তবে এই বিচার হতে হবে ‘কাঠামোগত’। কেবল কয়েকজনের শাস্তি নয়, বরং যে ‘সিস্টেম’ ব্যবহার করে জনমতকে পদদলিত করা হয়েছিল, সেই ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন।
বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপির ‘রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা’ এবং প্রধানমন্ত্রীর ‘সংস্কার ম্যান্ডেট’ আসলে এই ডিপ স্টেটকে নিয়ন্ত্রণে আনারই একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলপত্র। প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা কমিয়ে ভারসাম্য আনা, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠন এবং বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়া হলে কোনো অদৃশ্য শক্তি আর মাথাচাড়া দিতে পারবে না। বিশেষ করে গোয়েন্দা সংস্থা ও আমলাতন্ত্রকে সংসদের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং তাদেরকে নির্দিষ্ট কাজের মধ্যে রেখে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হতে না দেওয়া, গণতান্ত্রিক দৃঢ়তার জন্য অতীব জরুরি।
ডিপ স্টেট হলো গণতন্ত্রের ক্যান্সার
ডিপ স্টেট হলো গণতন্ত্রের দেহের এমন এক সংক্রামক ব্যাধি, যা ভেতর থেকে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে কুরে কুরে খায়। যখন একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জাতীয় নিরাপত্তার বদলে রাজনৈতিক দল ভাঙা-গড়ার কারিগর হয়ে ওঠে, কিংবা আমলারা জনসেবকের পোশাক ছেড়ে শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়—তখন পবিত্র সংবিধান কেবল একটি অর্থহীন কাগজে পরিণত হয়।
১/১১-এর সেই অদৃশ্য নেটওয়ার্ক কেবল একটি বিশেষ সময়ের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকটে তা ভিন্ন ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়ে নাগরিকের সার্বভৌমত্বকে সংকুচিত করেছে। ১/১১-এর এই তিক্ত ইতিহাস আমাদের স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয় যে, একটি টেকসই ও কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এই অদৃশ্য ক্ষমতার বলয়কে উপড়ে ফেলা অপরিহার্য।
রাষ্ট্র যদি তার অতীতের এই অন্ধকার অধ্যায়ের মুখোমুখি হয়ে কাঠামোগত জবাবদিহি নিশ্চিত করার সাহস দেখায়, তবেই একটি দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে উঠবে। কারণ, শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার বন্দুকের নলে কিংবা গোয়েন্দা নজরদারিতে নয়, বরং ন্যায়ের প্রতি তার অটল অঙ্গীকার এবং জনগণের আস্থার ওপর নিহিত।
১/১১, ডিপ স্টেট এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
১/১১-এর ঘটনাপ্রবাহ এবং ‘ডিপ স্টেট’-এর সক্রিয়তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত ও সতর্কবার্তা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই দুইয়ের মেলবন্ধন রাষ্ট্রকে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ—অর্থাৎ ‘জনগণের শাসন’—একটি অদৃশ্য ক্ষমতা কাঠামোর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। ফলে গণতন্ত্রের স্বচ্ছ ও সমৃণ ভবিষ্যতের জন্য ১/১১ এবং ডিপ স্টেট, উভয়বিদ বিষয়েই সর্তক থাকা জরুরি।
গণতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষা ও ১/১১-এর শিক্ষা
১/১১ শিখিয়েছে যে, যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চরম অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়, তখন ‘ডিপ স্টেট’ বা রাষ্ট্রের ভেতরকার অদৃশ্য শক্তি সেই সুযোগ গ্রহণ করে। ‘মাইনাস-টু ফর্মুলা’ বা বিরাজনীতিকরণের যে চেষ্টা সেদিন করা হয়েছিল, তা প্রমাণ করে যে—জনবিচ্ছিন্ন কোনো সংস্কার বা চাপিয়ে দেওয়া শাসন কখনো টেকসই হয় না। গণতন্ত্রের বিপদ সেখানেই, যেখানে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা জনগণের ভোটের বদলে গোয়েন্দা সংস্থা বা আমলাতন্ত্রের ‘ম্যানেজমেন্ট’-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে শক্ত অবস্থান গণতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যেই প্রয়োজন।
রাষ্ট্র মেরামত ও উত্তরণের পথ
বর্তমানে যে ‘রাষ্ট্র মেরামতের’ বা সংস্কারের ম্যান্ডেট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তার সার্থকতা নির্ভর করছে এই ডিপ স্টেটকে কতটা সফলভাবে শৃঙ্খলিত করা যায় তার ওপর। বিএনপির ‘৩১ দফা’ কিংবা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার এজেন্ডা—উভয়ই একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রকাঠামোর কথা বলছে।
ক্ষমতার ভারসাম্য: প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা হ্রাস এবং দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠন করা হলে ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রিকতা দূর হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা: বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনকে যদি প্রকৃত অর্থে ডিপ স্টেটের প্রভাবমুক্ত করা যায়, তবেই আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
জবাবদিহিতা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনকে কঠোর আইনি কাঠামোর আওতায় এনে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির (সংসদ) কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
ন্যায়ের অঙ্গীকারই রাষ্ট্রের শক্তি
গণতান্ত্রিক শুদ্ধতার জন্য ১/১১-এর বিচার এবং কাঠামোগত সংস্কার একে অপরের পরিপূরক। কেবল বিচার করলে তা প্রতিহিংসা মনে হতে পারে, আবার কেবল সংস্কার করলে অতীতের অপরাধীরা দায়মুক্তি পেয়ে যাবে। রাষ্ট্রকে যদি তার নৈতিক বৈধতা পুনরুদ্ধার করতে হয়, তবে অতীতের এই অন্ধকার অধ্যায়ের সাথে তাকে সততার সাথে মোকাবিলা করতে হবে। ১/১১ প্রসঙ্গে কমিশন গঠন করে শ্বেতপত্র প্রকাশ ও বিচারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের শাস্তি বিধানের পাশাপাশি অনির্বাচিত অদৃশ্য শক্তির ক্ষমতাচর্চার পথ চিরতরে রদ্ধ করাও অত্যাবশ্যক।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি সচেতন নাগরিক সমাজ এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর। যারা, রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বদা মনে রাখবেন যে, প্রকৃত শক্তি বন্দুকের নলে কিংবা গোয়েন্দা নজরদারিতে নয়, বরং জনগণের আস্থা এবং ন্যায়ের প্রতি তার অটল অঙ্গীকারের মধ্যে নিহিত। ১/১১-এর পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে ‘অদৃশ্য ক্ষমতা’র অবসান ঘটিয়ে ‘দৃশ্যমান জনমত’-কে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনপ্রতিনিধিত্বকে শক্তিশালী করে যোগ্য নেতৃত্বের জন্যের প্রস্তুত করতে হবে। তাহলেই অধীনস্থ ও অমনোনীত কেউ অদৃশ্য কলকাঠি নাড়িয়ে ১/১১ ঘটাতে বা ডিপ স্টেটের মাধ্যমে রাষ্ট্র চালাতে পারবে না। তাই গণতন্ত্রের বিপদ উত্তরণের স্বার্থে ১/১১, ডিপ স্টেট ও বিচার, এই তিনটি বিষয়কে এক ও অভিন্ন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রতিকারের পথ সন্ধান করা কর্তব্য।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 5   +   4   =