মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে ১৫ দফার শান্তি পরিকল্পনার কথা বলছেন, কূটনীতিকদের ধারণা সেটি আসলে প্রায় এক বছর আগে পারমাণবিক আলোচনার সময় তার প্রতিনিধি দলের দেয়া একটি প্রস্তাবের কাটছাট সংস্করণ। ২০২৫ সালের মে মাসের শেষদিকে আলোচনার ভিত্তি ছিল এই মূল ১৫ দফার পরিকল্পনাটি। তবে ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিমান হামলা চালানোর পর সেই আলোচনা ভেস্তে যায়। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবি করা পরিকল্পনায় কী আছে এবং গত মে মাসে ইরানের কাছে পেশ করা সেই পুরনো নথি থেকে এটি কতটা আলাদা, তা নিয়েই এখন অনেক জল্পনা চলছে।
পরিকল্পনাটি যদি এক বছর আগে ইরানের প্রত্যাখ্যান করা সেই পুরনো প্রস্তাবের পুনরাবৃত্তি হয়, তবে তা ইঙ্গিত দেয় যে এই সপ্তাহে হতে যাওয়া আলোচনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হয় সিরিয়াস নয়, অথবা ট্রাম্প সোমবার এটি বোঝাতে চেয়েছেন যে তিনি চুক্তির পথে বাস্তবে যতটা এগিয়েছেন তার চেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে।
ইরান অভিযোগ করেছে, সোমবার রাতে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার হুমকি স্থগিত করে ট্রাম্প মূলত মার্কিন বাজার খোলার আগে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছেন। ট্রাম্প বলেছিলেন, ১৫ দফার ঐকমত্যে পৌঁছানো যায় কি না তা দেখার জন্য তিনি পাঁচ দিন হামলা পিছিয়ে দিচ্ছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, গত দুই দিনের অত্যন্ত ভালো এবং ফলপ্রসূ আলোচনার অগ্রগতি হয়েছে। তবে ইরান কোনো ধরনের গোপন আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে। দেশটির মতে শুধুমাত্র আলোচনা পুনরায় শুরুর বিষয়ে পরোক্ষ কথাবার্তা হয়েছে।
২০২৫ সালে তৈরি করা যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফার কিছু পয়েন্ট এখন সেকেলে হয়ে পড়েছে, কারণ এর মধ্যে ২০২৬ সালে তিন দফা আলোচনা হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, বিশেষ করে প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।
আলোচনার ঘনিষ্ঠ কিছু কূটনীতিক মনে করেন না যে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো খসড়া তৈরি করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র যদি এমন কোনো পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেও থাকে, তবে সেটি এখনও ইরানিদের দেখানো হয়নি, তাদের সম্মতি নেয়া তো দূরের কথা।
২০২৫ সালের মে মাসের সেই ১৫ দফার পরিকল্পনাটিকে যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘টার্ম শিট’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেয়া একতরফা একটি পরিকল্পনা, যেখানে এমন অনেক প্রস্তাব ছিল যা মেনে নেয়া ইরানের জন্য কঠিন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার ফলে প্রাপ্ত অর্থের ব্যবহারে বিধিনিষেধ। পরিকল্পনাটিতে শুধুমাত্র পারমাণবিক-সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার কথা বলা হয়েছিল, মানবাধিকার-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে পাওয়া অর্থ ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যবহার করতে পারবে না। প্রস্তাবে আরও ছিল যে, ইউরেনিয়ামের সমস্ত মজুদ অবিলম্বে ইরানের বাইরে পাঠিয়ে দিতে হবে এবং তা কমিয়ে ৩.৬৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। এক মাসের মধ্যে সমস্ত সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা ব্যবহারের অনুপযোগী করতে হবে এবং সেন্ট্রিফিউজগুলো অকেজো করে দিতে হবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বাইরে একটি ফুয়েল ফার্মসহ নতুন বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে অর্থায়নে সহায়তা করবে, যা জাতিসংঘ পর্যবেক্ষকদের পরিদর্শনের অধীনে থাকবে।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং সৌদি আরবকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক সমৃদ্ধকরণ কনসোর্টিয়াম গঠনেরও প্রস্তাব ছিল। এই কনসোর্টিয়ামের একজন বিদেশি ম্যানেজার থাকতে পারে।
সম্ভবত পাকিস্তানের তত্ত্বাবধানে ইসলামাবাদে হতে যাওয়া নতুন আলোচনায় ইরান চাইবে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু যেন হয় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে আর কোনো সামরিক হামলা না চালানোর অঙ্গীকার। হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার বিষয়টিও ইরানকে স্পষ্ট করতে হবে। এছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলো একটি অনাক্রমণ চুক্তির মাধ্যমে ইরানের কাছ থেকে নিরাপত্তার গ্যারান্টি চাইবে।
ফলস্বরূপ, আগের ইরান-মার্কিন আলোচনার চেয়ে এবারের চুক্তি করা আরও কঠিন হবে বলে মনে হচ্ছে। কারণ এখন আলোচনার বিষয়গুলো শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, যা ছিল ১৫ দফার মূল লক্ষ্য। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ মঙ্গলবার আলোচনার প্রস্তাব নিশ্চিত করেছেন এবং আশা করা হচ্ছে জেডি ভ্যান্স সেখানে উপস্থিত থাকবেন। ভ্যান্সকে যুদ্ধের বিরোধী হিসেবে দেখা হয় বলে তার উপস্থিতি ইরানকে কিছুটা আশ্বস্ত করতে পারে।
এদিকে, ইরানে হামলার যৌক্তিকতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং জি-৭ এর বাকি শিল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে ফাটল প্যারিসে সংস্থাটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই বৈঠকে যোগ দেবেন। তবে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং জাপান ইতিমধ্যেই জানিয়েছে যে তারা এই যুদ্ধকে সমর্থন করে না, যাকে তারা বেআইনি এবং অপ্রয়োজনীয় মনে করে। এই ছয়টি দেশই মধ্যপ্রাচ্যে তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের স্বাধীনতার ওপর জোর দিলেও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যেকোনো হস্তক্ষেপ কেবল যুদ্ধবিরতির পরেই সম্ভব।


