অনলাইন ডেস্ক, ডেইলি পূর্বাচল
প্রকাশিত: ৮ নভেম্বর, ২০২৬
প্রকাশিত: ৮ নভেম্বর, ২০২৬
পোশাকশিল্পে সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার পেছনে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। গোয়েন্দা ও প্রশাসনের তদন্তে উঠে এসেছে সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের মালিকানাধীন শতাধিক কারখানার নাম। বিস্তারিত পড়ুন ডেইলি পূর্বাচলে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ অনুসন্ধানে ইতিমধ্যেই এমন শতাধিক কারখানার একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যাদের মালিক বা নিয়ন্ত্রণকারীদের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগসূত্র রয়েছে। পুলিশের দাবি, সাধারণ শ্রমিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সুপরিকল্পিত উপায়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার এক অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল।
নেপথ্যে ছিলেন যারা: গোয়েন্দা তালিকায় শীর্ষ নাম
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অস্থিরতা উসকে দেওয়ার পেছনে অভিযুক্ত কারখানাগুলোর মালিকানায় রয়েছেন বিগত সরকারের একাধিক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তালিকায় উল্লেখযোগ্যভাবে যাদের নাম উঠে এসেছে:
- রেনেসা গ্রুপ: সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠান।
- সেপাল গ্রুপ: সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির নিয়ন্ত্রণে থাকা ৪টি তৈরি পোশাক কারখানা।
- তুষকা গ্রুপ: আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ফয়জুর রহমান বাদলের মালিকানাধীন কারখানা।
- স্টারলিং গ্রুপ: আওয়ামী লীগের সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমানের প্রতিষ্ঠান।
- ইসলাম গ্রুপ ও বেক্সিমকো: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেশ কিছু কারখানা।
‘আন্দোলনকারীরা বহিরাগত’, আতঙ্কে সাধারণ শ্রমিকেরা
চলমান এই অস্থিরতা নিয়ে তৈরি পোশাক খাতের সাধারণ শ্রমিক ও কারখানার মালিকপক্ষ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাভার ও গাজীপুরের একাধিক গার্মেন্টসকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কারখানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের কোনো ক্ষোভ বা আন্দোলন ছিল না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিক জানান, মূলত বাইর থেকে আসা উগ্র উসকানিদাতারা লাঠিসোঁটা নিয়ে কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে। কারখানার ক্ষতি হলে নিজেদের রুটি-রুজি বন্ধ হয়ে যাবে—এমন আশঙ্কায় সাধারণ শ্রমিকেরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
তৈরি পোশাক খাতের চলমান সংকট নিয়ে স্টাইলিশ গার্মেন্টসের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন চৌধুরী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “গত দুই বছরে নানা প্রতিকূলতায় পোশাক খাতে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক যেমন বেকার হয়েছেন, তেমনি কারখানার ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে গেছে। এই শিল্পে নতুন করে কোনো চাপ সৃষ্টি হলে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঝুঁকিতে পড়বে। পোশাকশিল্প শুধু মালিকদের নয়, এর সঙ্গে লাখো শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের জীবিকা জড়িত।”
আন্তর্জাতিক মহলে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, এই অস্থিরতার পেছনে কেবল স্থানীয় স্বার্থ নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও জড়িত ছিল। গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) জসীম উদ্দিন এ প্রসঙ্গে জানান, “শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে দেশকে অস্থিতিশীল করতে একটি পক্ষ সক্রিয় ভূমিকা রাখছিল। আমরা এমন অনেককে শনাক্ত করেছি, যারা বিভিন্ন নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে জড়িত। এমনকি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতৃস্থানীয় সদস্যরাও এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছিলেন।”
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতকে ‘অনিরাপদ ও বিশৃঙ্খল’ হিসেবে উপস্থাপন করে ক্রেতা (বায়ার) হারানোর উদ্দেশ্যেই এই নাশকতা চালানো হয়েছিল।
কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি প্রশাসনের
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) নুরুল করিম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, সাধারণ পোশাকশ্রমিকেরা এই সহিংসতার সাথে জড়িত নন। উসকানিদাতাদের মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে আরও উচ্চতর ও নিবিড় তদন্ত চলছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “অভিযুক্ত কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে যদি নাশকতা বা উসকানির সত্যতা মেলে, তবে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভিন্ন সংস্থাকে ইতিমধ্যেই মাঠে নামানো হয়েছে এবং খুব দ্রুতই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।”


