রাজনীতি

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পদ বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য পরিধি

দৈনিক পূর্বাচল

নিজস্ব প্রতিবেদক

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ কার্যকর করার পদ্ধতি স্পষ্ট করতে রুলস অব প্রসিডিউর (কার্যপ্রণালী বিধি) সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) প্রসিকিউশন কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম এই তথ্য জানান। তিনি জানান, কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধন সম্পন্ন হলে তা শেখ হাসিনার মামলাসহ ইতোমধ্যে দেওয়া অন্যান্য রায়ের ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে।

গত ১৭ জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই রায়ে তাদের নামে থাকা সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণের নির্দেশও প্রদান করা হয়। এই রায়ের পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তার ঠিক কোন কোন সম্পদ বাজেয়াপ্তের আওতায় আসবে।

নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামা এবং অনুসন্ধানী নথিপত্র পর্যালোচনা করে শেখ হাসিনার নামে থাকা বিভিন্ন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের একটি বিশদ বিবরণ পাওয়া গেছে।

সম্পদের বিবরণ ও হলফনামার তথ্য

  • মোট সম্পদ: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-৩ আসনে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী, তার মোট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

  • বার্ষিক আয় ও বিনিয়োগ: ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী তার বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ টাকা, যার বড় অংশ এসেছে কৃষিখাত থেকে। এ ছাড়া সিকিউরিটিজ, ফিক্সড ডিপোজিট ও সঞ্চয়পত্রেও তার উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে।

  • যানবাহন ও অন্যান্য: তার নামে তিনটি মোটরগাড়ি রয়েছে, যার মধ্যে একটি উপহার এবং অন্য দুটির মূল্য প্রায় সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা। এছাড়া ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান ধাতু এবং ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকার আসবাবপত্র রয়েছে।

  • কৃষিজমি: হলফনামা অনুযায়ী তার নামে ১৫ দশমিক ৩ বিঘা কৃষিজমি রয়েছে, যা টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ সদর, গাজীপুর ও রংপুরে অবস্থিত। এর মধ্যে টুঙ্গিপাড়ায় তিনতলা ভবনসহ ৬ দশমিক ১০ শতক জমির উল্লেখ রয়েছে।

  • পূর্বাচল প্লট: পূর্বাচলে শেখ হাসিনার নামে একটি প্লট রয়েছে, যার ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছিল ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামেও অতিরিক্ত প্লট বরাদ্দের তথ্য রয়েছে, যা বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনি প্রক্রিয়ার অধীনে রয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধান ও অন্যান্য সম্পত্তি ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে ২০২৫ সালে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেয় দুদক। দুদকের দাবি অনুযায়ী, সে সময় প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে প্রায় ২১ দশমিক ৯১ একর কৃষিজমির তথ্য গোপন করা হয়েছিল। এছাড়া শুল্কমুক্ত সুবিধা ব্যবহার করে আমদানি করা ২ লাখ ৩০ হাজার ইউরো মূল্যের একটি মার্সিডিজ-বেঞ্জ গাড়ি ধানমন্ডির ‘সুধা সদন’ ঠিকানায় নিবন্ধিত ছিল যা তিনি ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। সুধা সদনের বর্তমান মালিকানা তার সন্তান সজীব ওয়াজেদ ও সায়মা ওয়াজেদের নামে রয়েছে।

অপরদিকে, ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবনটি পূর্বে শেখ হাসিনার মালিকানাধীন থাকলেও পরবর্তীতে এটি ‘বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। ফলে ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত এই স্মৃতি জাদুঘরটি ব্যক্তিগত সম্পত্তির আওতায় বাজেয়াপ্ত করা হবে কি না, তা সম্পূর্ণভাবে আলাদা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধনের পর এই সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণের আইনি কাঠামো ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment